Showing posts with label পড়াশুনা. Show all posts
Showing posts with label পড়াশুনা. Show all posts

Class Nine-Ten Math Solution download | Nhrepon.com

নবম ও দশম ( এস. এস. সি ) শ্রেণীর গণিত  বইয়ের সম্পূর্ণ সমাধান


ডাউনলোড


করে নিন মাত্র এক ক্লিকেই।



































Class Eight Math Solution download | Nhrepon.com

৮ম শ্রেণীর গণিত বইয়ের সম্পূর্ণ সমাধান 


ডাউনলোড


করে নিন মাত্র এক ক্লিকেই  >>>>











































Class Seven Math Solution download | Nhrepon.com


৭ম শ্রেণীর গণিত বইয়ের সম্পূর্ণ সমাধান

ডাউনলোড

করে নিন মাত্র এক ক্লিকে >>>>>>>



































হযরত ইয়াকূব (আ:) | Prophet Yaqub | Nhrepon.com

হযরত ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম)



ইসহাক্ব (আঃ)-এর দুই যমজ পুত্র ঈছ ও ইয়াকূব-এর মধ্যে ছোট ছেলে ইয়াকূব নবী হন। ইয়াকূবের অপর নাম ছিল ‘ইস্রাঈল’। যার অর্থ আল্লাহর দাস। নবীগণের মধ্যে কেবল ইয়াকূব ও মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর দু’টি করে নাম ছিল। মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর অপর নাম ছিল ‘আহমাদ’ (ছফ ৬১/৬)।
ইয়াকূব তার মামুর বাড়ী ইরাকের হারান (حران) যাবার পথে রাত হয়ে গেলে কেন‘আনের অদূরে একস্থানে একটি পাথরের উপরে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন।
সে অবস্থায় স্বপ্ন দেখেন যে, একদল ফেরেশতা সেখান থেকে আসমানে উঠানামা করছে।
এরি মধ্যে আল্লাহ তাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন,


إنى سأبارك عليك واكثر ذريتك واجعل لك هذه الأرض ولعقبك من بعدك-


‘অতিসত্ত্বর আমি তোমার উপরে বরকত নাযিল করব, তোমার সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করে দেব, তোমাকে ও তোমার পরে তোমার উত্তরসূরীদের এই মাটির মালিক করে দেব’। তিনি ঘুম থেকে উঠে খুশী মনে মানত করলেন, যদি নিরাপদে নিজ পরিবারের কাছে ফিরে আসতে পারেন, তাহ’লে এই স্থানে তিনি একটি ইবাদতখানা প্রতিষ্ঠা করবেন এবং আল্লাহ তাকে যা রূযী দেবেন তার এক দশমাংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করবেন’।

অতঃপর তিনি ঐ স্থানে পাথরটির উপরে একটি চিহ্ন এঁকে দিলেন যাতে তিনি ফিরে এসে সেটাকে চিনতে পারেন। তিনি স্থানটির নাম রাখলেন, بيت إيل অর্থাৎ আল্লাহর ঘর। 

এই স্থানেই বর্তমানে ‘বায়তুল মুক্বাদ্দাস’ অবস্থিত, যা পরবর্তীতে প্রায় ১০০০ বছর পরে হযরত সুলায়মান (আঃ) পুনর্নির্মাণ করেন। মূলতঃ এটিই ছিল ‘বায়তুল মুক্বাদ্দাসের’ মূল ভিত্তি ভূমি, যা কা‘বা গৃহের চল্লিশ বছর পরে ফেরেশতাদের দ্বারা কিংবা আদম পুত্রদের হাতে কিংবা ইসহাক্ব (আঃ) কর্তৃক নির্মিত হয়।
নিশ্চিহ্ন হওয়ার কারণে আল্লাহ ইয়াকূব (আঃ)-কে স্বপ্নে দেখান এবং তাঁর হাতে সেখানে পুনরায় ইবাদতখানা তৈরী হয়।



ইস্রাঈলী বর্ণনা অনুযায়ী ইয়াকূব হারানে মামুর বাড়ীতে গিয়ে সেখানে তিনি তার মামাতো বোন ‘লাইয়া’ (ليّا) ও পরে ‘রাহীল’ (راحيل )-কে বিবাহ করেন এবং দু’জনের মোহরানা অনুযায়ী ৭+৭=১৪ বছর মামুর বাড়ীতে দুম্বা চরান। ইবরাহীমী শরী‘আতে দু’বোন একত্রে বিবাহ করা জায়েয ছিল।

পরে মূসা (আঃ)-এর শরী‘আতে এটা নিষিদ্ধ করা হয়। শেষোক্ত স্ত্রীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বসেরা সুন্দর পুরুষ ‘ইউসুফ’। অতঃপর দ্বিতীয় পুত্র বেনিয়ামীনের জন্মের পরেই তিনি মারা যান।

তাঁর কবর বেথেলহামে (بيت لحم) অবস্থিত এবং ‘ক্ববরে রাহীল’ নামে পরিচিত। পরে তিনি আরেক শ্যালিকাকে বিবাহ করেন। ইয়াকূবের ১২ পুত্রের মধ্যে ইউসুফ নবী হন। প্রথমা স্ত্রীর পুত্র লাভী (لاوى) -এর পঞ্চম অধঃস্তন পুরুষ মূসা ও হারূণ নবী হন। এভাবে ইয়াকূব (আঃ)-এর বংশেই নবীদের সিলসিলা জারি হয়ে যায়।

ইয়াকূব-এর অপর নাম ‘ইসরাঈল’ অনুযায়ী তাঁর বংশধরগণ ‘বনু ইস্রাঈল’ নামে পরিচিত হয়। হঠকারী ইহুদী-নাছারাগণ যাতে তারা ‘আল্লাহর দাস’ একথা বারবার স্মরণ করে, সেকারণ আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তাদেরকে ‘বনু ইস্রাঈল’ বলেই স্মরণ করেছেন।



হারান থেকে ২০ বছর পর ইয়াকূব তাঁর স্ত্রী-পরিজন সহ জন্মস্থান ‘হেবরনে’ ফিরে আসেন। যেখানে তাঁর দাদা ইবরাহীম ও পিতা ইসহাক্ব বসবাস করতেন। যা বর্তমানে ‘আল-খলীল’ নামে পরিচিত। পূর্বের মানত অনুসারে তিনি যথাস্থানে বায়তুল মুক্বাদ্দাস মসজিদ নির্মাণ করেন (ঐ)।



কেন‘আন-ফিলিস্তীন তথা শাম এলাকাতেই তাঁর নবুঅতের মিশন সীমায়িত থাকে। ইউসুফ কেন্দ্রিক তাঁর জীবনের বিশেষ ঘটনাবলী ইউসুফ (আঃ)-এর জীবনীতে আলোচিত হবে। তিনি ১৪৭ বছর বয়সে মিসরে মৃত্যুবরণ করেন এবং হেবরনে পিতা ইসহাক (আঃ)-এর কবরের পাশে সমাধিস্থ হন।



উল্লেখ্য যে, হযরত ইয়াকূব (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ১০টি সূরায় ৫৭টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।


ইয়াকূবের অছিয়ত:

কেন‘আন থেকে মিসরে আসার ১৭ বছর পর মতান্তরে ২৩ বছরের অধিক কাল পরে ইয়াকূবের মৃত্যু ঘনিয়ে এলে তিনি সন্তানদের কাছে ডেকে অছিয়ত করেন। সে অছিয়তটির মর্ম আল্লাহ নিজ যবানীতে বলেন, 

وَوَصَّى بِهَا إِبْرَاهِيْمُ بَنِيْهِ وَيَعْقُوْبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّيْنَ فَلاَ تَمُوْتُنَّ إَلاَّ وَأَنتُمْ مُّسْلِمُوْنَ - أَمْ كُنتُمْ شُهَدَآءَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوْبَ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيْهِ مَا تَعْبُدُوْنَ مِن بَعْدِي قَالُواْ نَعْبُدُ إِلَـهَكَ وَإِلَـهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيْمَ وَإِسْمَاعِيْلَ وَإِسْحَاقَ إِلَـهاً وَّاحِداً وَّنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُوْنَ- (البقرة ১৩৩)


‘এরই অছিয়ত করেছিল ইবরাহীম তার সন্তানদের এবং ইয়াকূবও যে, হে আমার সন্তানগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য দ্বীনকে মনোনীত করেছেন। অতএব তোমরা অবশ্যই মুসলিম না হয়ে মরো না’ (বাক্বারাহ ১৩২)। ‘তোমরা কি তখন উপস্থিত ছিলে, যখন ইয়াকূবের মৃত্যু ঘনিয়ে আসে? যখন সে সন্তানদের বলল, আমার পরে তোমরা কার ইবাদত করবে? তারা বলল, আমরা আপনার উপাস্য এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাক্বের উপাস্যের ইবাদত করব- যিনি একক উপাস্য এবং আমরা সবাই তাঁর প্রতি সমর্পিত’ (বাক্বারাহ ২/১৩৩)। 



শুরুতে বলা হয়েছে ‘এরই অছিয়ত করেছিলেন ইবরাহীম। কিন্তু সেটা কি ছিল? আল্লাহ বলেন, 



إِذْ قَالَ لَهُ رَبُّهُ أَسْلِمْ قَالَ أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِيْنَ- (البقرة ১৩১)- 



‘স্মরণ কর যখন তাকে তার পালনকর্তা বললেন, আত্মসমর্পণ কর। সে বলল, আমি বিশ্বপালকের প্রতি আত্মসমর্পণ করলাম’ (বাক্বারাহ ২/১৩১)। অর্থাৎ ইবরাহীমের অছিয়ত ছিল তাঁর সন্তানদের প্রতি ইসলামের। তাঁর পৌত্র ইয়াকূবেরও অছিয়ত ছিল স্বীয় সন্তানদের প্রতি ইসলামের। এজন্য ইবরাহীম তার অনুসারীদের নাম রেখেছিলেন- ‘মুসলিম’ বা আত্মসমর্পিত (হজ্জ ২২/৭৮)।
ইবরাহীম তাঁর অপর প্রার্থনায় মুসলিম-এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে فَمَن تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ، ‘যে ব্যক্তি আমার অনুসরণ করল, সে ব্যক্তি আমার দলভুক্ত। কিন্তু যে ব্যক্তি আমার অবাধ্যতা করল, তার বিষয়ে আল্লাহ তুমি ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (ইবরাহীম ১৪/৩৬)। 



বুঝা গেল যে, ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব প্রমুখ নবীগণের ধর্ম ছিল ‘ইসলাম’। তাদের মূল দাওয়াত ছিল তাওহীদ তথা আল্লাহর ইবাদতে একত্ব। শুধুমাত্র আল্লাহর স্বীকৃতির মধ্যে তা সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তাঁর বিধানের প্রতি আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের মধ্যেই তার যথার্থতা নিহিত ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে তাদের অনুসারী হবার দাবীদার ইহুদী-নাছারাগণ তাদের নবীগণের সেই অছিয়ত ভুলে যায় এবং অবাধ্যতা, যিদ ও হঠকারিতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়ে তারা আল্লাহর অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্ট (المغضوب والضآلين) জাতিতে পরিণত হয়। [4] 



ইবরাহীম ও ইয়াকূবের অছিয়তে এটা প্রমাণিত হয় যে, সন্তানের জন্য দুনিয়াবী ধন-সম্পদ রেখে যাওয়ার চাইতে তাদেরকে ঈমানী সম্পদে সম্পদশালী হওয়ার অছিয়ত করে যাওয়াই হ’ল দূরদর্শী পিতার প্রধানতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। 


আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল | imf | international monetary fund | Nhrepon.com

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল



IMF এর পূর্ণ  রূপ  International Monetary Fund

১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে ব্রেটন উড্স সম্মেলনে স্বাক্ষরিত চুক্তির ভিত্তিতে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু হয় ১৯৪৭ সালের ১লা মার্চ।

বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১৮৮টি দেশ। সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত। এ সংস্থার নির্বাহী প্রধানের পদবি ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

আর্থিক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসারের জন্য সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করা, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর স্থিতিশীল বিনিময় ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমস্যা সমাধানের জন্য আর্থিক সাহায্য প্রদান করা এবং কারিগরি সাহায্য প্রদানের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়ন করা এ সংস্থার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ।

এর সাংগঠনিক কাঠামো গঠিত পরিচালক পর্ষদ, কার্যনিবাহী পরিচালকমণ্ডলী, প্রধান পরিচালক ও সচিবালয় নিয়ে। বর্তমানে IMF  এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে রয়েছেন, ফ্রান্সের ক্রিস্তিন লাগার্দ (৫ জুলাই ২০১১ থেকে বর্তমান)

This is a short note on IMF.

WMF: World Monetary Fund






দাইউস (dayus) কাকে বলে? দাইউস এর পরিণতি কি ?

দাইউস

(dayus) 


দাইউসঃ-  দাইউস হলো সে ব্যক্তি যে কিনা তার পরিবার পরিজনকে সঠিক রাস্তায় পরিচালনা করেন না এবং পরিবার পরিজন সঠিক ভাবে না চললেও ভালো মনে করেন বা প্রতিবাদ করেন না। যে ব্যক্তি তার স্ত্রী-সন্তানদের বেপর্দা বেহায়াপনা ও অশ্লীলতার সুযোগ দেয় তাকেও দাইউস বলা হয়।


 রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন যে, “আল্লাহ তিন ব্যক্তির জন্য জান্নাত হারাম করেছেন। মাদকাসক্ত, পিতা-মাতার অবাধ্য এবং দাইউস, যে তার পরিবারের মধ্যে ব্যভিচারকে প্রশ্রয় দেয়” (মুসনাদে আহমাদ: ২/৬৯)


 কোরআনে আল্লাহ বলেন, “তোমরা নিজেরা জাহান্নাম থেকে আত্মরক্ষা কর এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা কর। যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর; যার উপর নিয়োজিত রয়েছেন কঠোর হৃদয় সম্পন্ন ফিরিশতাগণ, তারা আল্লাহ যা নির্দেশ করেন তা বাস্তবায়নে অবাধ্য হোন না, আর তাদের যা নির্দেশ প্রদান করা হয়, তা-ই তামিল করে’’।
( সূরা আত-তাহরীম: ৬)


 রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেন : ‘দাইউস ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহ্‌র রাসূল (সাঃ) দাইউস কে? উত্তরে রাসুলূল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘যে ব্যক্তি তার পরিবারে আল্লাহ্‌র আদেশ-নিষেধ বাস্তবায়নের ব্যাপারে কোন তৎপরতা অবলম্বন করে না বরং উপেক্ষা করে চলে।’ অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, ‘দাইউস হল সে, যে তার পরিবারে বেহায়পনার বাস্তবায়নে সন্তষ্ট ও পরিতুষ্ট।’ (আহমদ)


 রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্বাধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, রাষ্ট্রনেতা তার প্রজাদের সম্পর্কে দায়িত্বশীল আর তাকে তাদের পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। 

একজন পুরুষ লোক তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তাকে তাদের পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন মহিলা তার স্বামীর ঘরের সার্বিক ব্যাপারে দায়িত্বশীলা, তাকে সেটার পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। 

একজন পরিচারক তার মালিকের সম্পদের সংরক্ষক, আর তাকে সেটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এক কথায় তোমরা সবাই দায়িত্বশীল আর সবাই জিজ্ঞাসিত হবে সে দায়িত্ব সম্পর্কে”। (বুখারী : ৭১৩৮; মুসলিম: ১৭০৫)





আদর্শ ছেলে | Adorsho chele - amader deshe hobe sei chele kobe | Nhrepon.com




আদর্শ ছেলে 

কুসুমকুমারী দাশ

আমাদের দেশে সেই ছেলে কবে হবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?
মুখে হাসি বুকে বল, তেজে ভরা মন
'মানুষ হইতে হবে'- এই তার পণ।

বিপদ আসিলে কাছে হও আগুয়ান
নাই কি শরীরে তব রক্ত, মাংস, প্রাণ?
হাত পা সবারই আছে, মিছে কেন ভয়?
চেতনা রয়েছে যার, সে কি পড়ে রয়?

সে ছেলে কে চাই বল, কথায় কথায়
আসে যার চোখে জল, মাথা ঘুরে যায়?
মনে প্রাণে খাট সবে, শক্তি কর দান,
তোমরা 'মানুষ' হলে দেশের কল্যাণ।










নবীর শিক্ষা | nobir shikkha | bangla kobita | nhrepon.com

নবীর শিক্ষা

শেখ হাবিবুর রহমান


তিন দিন হ'তে খাইতে না পাইনাই কিছু মোরে ঘরে,
সারা পরিবার বাড়িতে আমার উপোস করিয়া মরে।
নাহি পাই কাজ তাই ত্যাজি লাজ বেড়াই ভিক্ষা করি,
হে দয়াল নবীদাও কিছু মোরে নহিলে পরাণে মরি।


আরবের নবীকরুণার ছবি ভিখারির পানে চাহি,
কোমল কণ্ঠে কহিল, -'তোমার ঘরে কি কিছুই নাহি?
বলিল সে, 'আছে শুধু মোর কম্বল একখানি।'
কহিল রসুল, 'এক্ষণি গিয়া দাও তাহা মোরে আনি।'


সম্বল তার কম্বলখানি বেচিয়া তাহার করে,
অর্ধেক দাম দিলেন রসুল খাদ্য কেনার তরে,
বাকি টাকা দিয়া কিনিয়া কুঠারহাতল লাগায়ে নিজে,
কহিলেন, 'যাও কাঠ কেটে খাওদেখ খোদা করে কি-যে।'


সেদিন হইতে শ্রম সাধনায় ঢালিল ভিখারি প্রাণ,
বনের কাষ্ঠ বাজারে বেচিয়া দিন করে গুজরান।
অভাব তাহার রহিল না আরহইল সে সুখী ভবে,


নবীর শিক্ষা ক'রো না ভিক্ষা, মেহনত কর সবে।



পল্লি কবি জসীম উদ্দীন | Nhrepon.com

পল্লি কবি জসীম উদ্দীন

একজন বাঙালি কবি, গীতিকার, ঔপন্যাসিক ও লেখক।


Polli-kobi-josim-uddin



জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯০৩ খ্রী:

মৃত্যু: ১৩ মার্চ ১৯৭৬ খ্রী:

পূর্ণনাম: মোহাম্মাদ জসীম উদ্দীন মোল্লা।

জন্মস্থান: ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন।

বাবার নাম: আনসার উদ্দীন মোল্লা। তিনি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন।

মায়ের নাম: আমিনা খাতুন ওরফে রাঙাছুট।

পারিবারিক পরিচিতি: তার বাবার বাড়ি ফরিদপুর জেলার গোবিন্দপুর গ্রামে।

শিক্ষা জীবন: জসীম উদ্দীন ফরিদপুর ওয়েলফার স্কুল ও পরবর্তীতে ফরিদপুর জেলা স্কুলে পড়াশুনা করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৯ সালে বি.এ এবং ১৯৩১ সালে এম.এ শেষ করেন।

উল্লেখযোগ্য রচনাবলি: নকশী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট।

উল্লেখযোগ্য পুরস্কার: একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার


কাব্যগ্রন্থ:
রাখালী (১৯২৭
নকশী কাঁথার মাঠ (১৯২৯)
বালুচর (১৯৩০)
ধানখেত (১৯৩৩)
সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৪)
হাসু (১৯৩৮)
রুপবতি (১৯৪৬)
মাটির কান্না (১৯৫১)
এক পয়সার বাঁশী (১৯৫৬)
সকিনা (১৯৫৯)
সুচয়নী (১৯৬১)
ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে (১৯৬২)
মা যে জননী কান্দে (১৯৬৩)
হলুদ বরণী (১৯৬৬)
জলে লেখন (১৯৬৯)
পদ্মা নদীর দেশে (১৯৬৯)
কাফনের মিছিল (১৯৭৮)
মহরম
দুমুখো চাঁদ পাহাড়ি (১৯৮৭)


নাটক:
পদ্মাপার (১৯৫০)
বেদের মেয়ে (১৯৫১)
মধুমালা (১৯৫১)
পল্লীবধূ (১৯৫৬)
গ্রামের মেয়ে (১৯৫৯)
ওগো পুস্পধনু (১৯৬৮)
আসমান সিংহ (১৯৮৬)


আত্মকথা:
যাদের দেখেছি ((১৯৫১)
ঠাকুর বাড়ির আঙ্গিনায় (১৯৬১)
জীবন কথা ( ১৯৬৪)
স্মৃতিপট (১৯৬৪)
স্মরণের সরণী বাহি (১৯৭৮)


উপন্যাস:
বোবা কাহিনী (১৯৬৪)
ভ্রমণ কাহিনী:
চলে মুসাফির (১৯৫২)
হলদে পরির দেশে ( ১৯৬৭)
যে দেশে মানুষ বড় (১৯৬৮)
জার্মানীর শহরে বন্দরে (১৯৭৫)


সঙ্গীত:
রঙিলা নায়ের মাঝি (১৯৩৫)
গাঙের পাড় (১৯৬৪)
জারি গান (১৯৬৮)
মুর্শিদী গান (১৯৭৭)








collected form wikipedia

Our School Magazine | Nhrepon.com


Our School Magazine

1.      What is a school magazine?
2.      How is the magazine committee formed?
3.      How are the editors elected?
4.      What is the function of a business editor?
5.      What does the magazine contain?
6.      What is the necessity of publishing a magazine?

A school magazine is the mirror of the literary works of the teachers and the students of the school. We are the students of a renowned school in the district of Noakhali. We publish a magazine every year from our school. We have magazine committee consisting of nine members they are three teachers and six students. The headmaster acts as the chief patron of the committee. The other two teachers act as adviser and proof-reader. The other editors are elected from among the students. Spaces are sold to the business concerns for advertising of their products. We have a magazine found to meet the necessary essays, poems, stories, short plays, riddles, jokes etc written by the teachers and the students. Our school magazine is a great boon to us. It helps us express our feelings and thoughts and develop our creative powers. We are proud of our school magazine.

Or,

Our School Magazine

1.      What is a school magazine?
2.      What is the importance of a school magazine?
3.      Who keeps role to publish a school magazine?
4.      What is your role in your school magazine?

A school magazine is one kind of journal which contains mainly the articles of the students and teachers. It is published annually or Monthly. The editor of a school magazine is a teacher and the sub-editors are always chosen from the students. A school magazine plays an important role for the students. It helps to express the students  feelings and creative powers. It encourages students to think for themselves, to organize their information into knowledge and to take an active interest in all that is going on around them. The magazine committee may hold periodical competitions in poetry, short stories and essays and select the best of there for publication. I am an active partner in our school magazine and write articles and poems for our school magazine.


আবদুল মুত্তালিব | সাহাবীদের জীবনী

আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) এর জীবনী

sahabider-jiboni

আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব | সাহাবীদের জীবনী

নাম আবুল ফজল আব্বাস। পিতা আবদুল মুত্তালিব, মাতা নাতিলা, মতান্তরে নাসিলা বিনতু খাব্‌বাব। রাসূলুল্লাহর সা. চাচা। তবে দু’জন ছিলেন প্রায় সমবয়সী। ঐতিহাসিকদের ধারণা, সম্ভবতঃ তিনি রাসূলুল্লাহর সা. দুই বা তিন বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

ছোট বেলায় একবার তিনি হারিয়ে যান। মা মান্নত মানেন, আব্বাস ফিরে এলে কা’বায় রেশমী গিলাফ চড়াবেন। কিছু দিন পর তিনি সহি-সালামতে ফিরে এলে অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে আবদুল মুত্তালিব তাঁর মান্নত পুরা করেন।

জাহিলী যুগে তিনি ছিলেন কুরাইশদের একজন প্রতাপশালী রঈস। পুরুষানুক্রমে খানায়ে কা’বার রক্ষণাবেক্ষণ ও হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্ব লাভ করেন।

রাসূলুল্লাহ সা. নবুওয়াত লাভ করলেন। মক্কায় প্রকাশ্যে তিনি তাওহীদের দাওয়াত দিতে লাগলেন। হযরত আব্বাস যদিও দীর্ঘ দিন যাবত প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেননি, তবে তিনি এ দাওয়াতের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।


এ কারণে মদীনার বাহাত্তর জন্য আনসার হজ্জের মওসুমে মক্কায় গিয়ে মিনার এক গোপন শিবিরে যে দিন রাসূলুল্লাহকে সা. মদীনায় হিজরাতের আহবান জানান এবং তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন, সেই গোপন বৈঠকেও হযরত আব্বাস উপস্থিত ছিলেন। তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। ইতিহাসে এ বাইয়াতকে আকাবার দ্বিতীয় শপথ বলা হয়। এ উপলক্ষে তিনি উপস্থিত মদীনাবাসীদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এক ভাষণে বলেনঃ ‘খাযরাজ কাওমের লোকেরা! আপনাদের জানা আছে, মুহাম্মাদ সা. স্বীয় গোত্রের মধ্যে সম্মান ও মর্যাদার সাথেই আছেন। শত্রুর মুকাবিলায় সর্বক্ষণ আমরা তাঁকে হিফাজত করেছি। এখন তিনি আপনাদের নিকট যেতে চান। যদি আপনারা জীবন পণ করে তাঁকে সহায়তা করতে পারেন তাহলে খুবই ভালো কথা। অন্যথায় এখনই সাফ সাফ বলে দিন।’ জবাবে মদীনাবাসীগণ পরিপূর্ণ সহায়তায় আশ্বাস দান করেন। এর অল্পকাল পরেই রাসূলুল্লাহ মদীনায় হিজরাত করেন।


মক্কার কুরাইশদের চাপের মুখে বাধ্য হয়ে তিনি কুরাইশ বাহিনীর সংগে বদর যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা. অবহিত ছিলেন, এ কারণে তিনি সাহাবীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘যুদ্ধের সময় আব্বাস বা বনু হাশিমের কেউ সামনে পড়ে গেলে তাদের হত্যা করবে না। কারণ, জোরপূর্বক তাদের রণক্ষেত্রে আনা হয়েছে।’


বদর যুদ্ধে অন্যান্য কুরাইশ মুশরিকদের সাথে আব্বাস, আকীল ও নাওফিল ইবন হারিস মুসলমানদের হাতে বন্দী হন। ঘটনাক্রমে, আব্বাসকে এত শক্তভাবে বাঁধা হয় যে, ব্যথায় তিনি কঁকাতে থাকেন। তাঁর সে কঁকানি রাসূলুল্লাহর সা. রাতের আরামে বিঘ্ন ঘটায়। একথা সাহাবায়ে কিরাম অবগত হলে তাঁরা আব্বাসের বাঁধন ঢিলা করে দেন। আব্বাস কঁকানি বন্ধ করে দিলেন। রাসূল সা. জিজ্ঞেস করলেনঃ কঁকানি শোনা যায় না কেন? বলা হলোঃ বাঁধন ঢিলা করে দেওয়া হয়েছে। তখুনি রাসূল সা. নির্দেশ দিলেন সকল বন্দীর বাঁধন ঢিলা করে দাও।


বদরের যুদ্ধবন্দীদের কাছে অতিরিক্ত কাপড় ছিল না। রাসূল সা. সকলকে পরিধেয় বস্ত্র দিলেন। হযরত আব্বাস ছিলেন দীর্ঘদেহী। কোন ব্যক্তির জামা তাঁর গায়ে লাগছিল না। আব্বাসের মত দীর্ঘদেহী ছিল মুনাফিক আবদুল্লাহ বিন উবাই। সে একটি জামা আব্বাসকে দান করে। এ কারণে মুনাফিক হওয়া সত্ত্বেও আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যুর পর পুত্রের অনুরোধে রাসূল সা. নিজের একটি জামা তার লাশের গায়ে পরানের জন্য দান করেন। এভাবে তিনি চাচার প্রতি কৃত ইহসান পরিশোধ করেন।


বদর যুদ্ধের কয়েদীদের মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। আব্বাসের জননী ছিলেন মদীনার আনসার-গোত্র খাযরাজের কন্যা। এ কারণে এ গোত্রের লোকেরা রসূলুল্লাহর সা. নিকট নিবেদন করলো, আব্বাস আমাদের ভাগ্নে। আমরা তাঁর মুক্তিপণ মাফ করে দিচ্ছি। কিন্তু সাম্যের পরিপন্থী হওয়ায় এ প্রস্তাব আল্লাহর রাসূলের নিকট গ্রহণযোগ্য হলো না। পক্ষান্তরে আব্বাস সম্পদশালী ব্যক্তি হওয়ার কারণে রাসূল সা. তাঁর নিকট মোটা অংকের মুক্তিপণ দাবী করেন।

আব্বাস এত বেশী অর্থ আদায়ে অক্ষমতা প্রকাশ করে বলেনঃ অন্তর থেকে আমি আগেই মুসলমান হয়েছিলাম। মুশরিকরা এ যুদ্ধে অংশ নিতে আমাকে বাধ্য করেছে। রাসূলুল্লাহ সা. বললেনঃ অন্তরের অবস্থা আল্লাহ জানেন। আপনার দাবী সত্য হলে আল্লাহ তার বিনিময় দেবেন। তবে বাহ্যিক অবস্থার বিচারে আপনাকে কোন প্রকার সুবিধা দেওয়া যাবে না। আর মুক্তিপণ আদায়ে আপনার অক্ষমতাও গ্রহণযোগ্য নয়।
কারণ, আমি জানি, মক্কায় উম্মুল ফজলের নিকট আপনি মোট অংকের অর্থ রেখে এসেছেন। বিস্ময়ের সাথে আব্বাস বলে উঠলেন, আল্লাহর কসম, আমি ও উম্মুল ফজল ছাড়া আর কেউ এ অর্থের কথা জানে না। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আপনি আল্লাহর রাসূল। অতঃপর তিনি নিজের, ভ্রাতুষ্পুত্র আকীল ও নাওফিল ইবন হারিসের পক্ষ থেকে মোটা অংকের মুক্তিপণ আদায় করে মুক্তি লাভ করেন।

আব্বাসের একটা দীর্ঘ সময় মক্কায় অবস্থান এবং প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা না দেওয়ার পশ্চাতে একা বিশেষ কারণ ছিল। তিনি সব সময় মক্কা থেকে কাফিরদের গতিবিধি রাসূলুল্লাহকে সা. অবহিত করতেন। তাছাড়া মক্কায় যেসব দুর্বল ঈমানের মুসলমান তখনো অবস্থান করছিল, তিনি ছিলেন তাদের ভরসাস্থল। এ কারণে একবার রাসূরুল্লাহর সা. নিকট হিজরাতের অনুমতি চাইলে তাঁকে এই বলে বিরত রাখেন যে, ‘আপনার মক্কায় অবস্থান করা শ্রেয়। যেভাবে আল্লাহ আমার উপর নবুওয়াত সমাপ্ত করেছেন তেমনি আপনার উপর হিজরাত সমাপ্ত করবেন।’

মক্কা বিজয়ের কিছুদিন পূর্বে হযরত আব্বাস হিজরাতের অনুমতি লাভ করেন। সপরিবারে রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হয়ে প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেন এবং স্থায়ীভাবে মদীনায় বসবাস শুরু করেন। তিনি মক্কা বিজয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। হুনাইন অভিযানে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে একই বাহনে আরোহী ছিলেন। তিনি বলেনঃ এ যুদ্ধে কাফিরদের জয় হলো এবং মুসলিম মুজাহিদরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়লো, রাসূল সা. বললেন, ‘আব্বাস, তীরন্দাজদের আওয়ায দাও।’ স্বভাবগতভাবেই আমি ছিলাম উচ্চকণ্ঠ। আহ্‌বান জানালামঃ আইনা আসহাবুল সুমরা’- তীরন্দাজরা কোথায়? আমার এই আওয়াযে মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল। তায়েফ অবরোধ, তাবুক অভিযান এবং বিদায় হজ্জেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন।

বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার পর রাসূল সা. অসুস্থ হয়ে পড়েন। দিন দিন অসুস্থতা বাড়তে থাকে। হযরত আলী, হযরত আব্বাস ও বনী হাশিমের অন্য লোকেরা রাসূলুল্লাহর সা. সেবার দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ওফাতের দিন হযরত আলী বাড়ীর বাইরে এলেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করলোঃ রাসূলুল্লাহর সা. অবস্থা কেমন? যেহেতু সে দিন অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছিল, এ কারণে তিনি বললেনঃ ‘আল্লাহর অনুগ্রহে একটু ভালো।’
 কিন্তু হযরত আব্বাস ছিলেন অভিজ্ঞ ব্যক্তি। তিনি আলীর একটি হাত ধরে বললেনঃ ‘তুমি কী মনে করেছো? আল্লাহর কসম, তিন দিন পরেই তোমরা গোলামী করতে শুরু করবে। আমি দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছি এ রোগেই অল্প দিনের মধ্যেই রাসুলুল্লাহ সা. ইনতিকাল করবেন। আমি আবদুল মুত্তালিব খান্দানের লোকদের চেহারা দেখেই তাদের মৃত্যু আন্দাজ করতে পারি।’


ঐ দিন রাসূল সা. ইনতিকাল করেন। হযরত আলী ও বনী হাশিমের অন্যান্যদের সহযোগিতায় হযরত আব্বাস কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করেন। যেহেতু তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. সম্মানিত চাচা এবং বনী হাশিমের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি, এ কারণে বহিরাগত লোকেরা তাঁর নিকট এসে শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করতে থাকে।


হযরত রাসূলে কারীম সা. চাচা আব্বাসকে খুব সম্মান করতেন। তাঁর সামান্য কষ্টতেও তিনি দারুণ দুঃখ পেতেন। একবার কুরাইশদের একটি আচরণ সম্পর্কে হযরত আব্বাস অভিযোগ করলে রাসূল সা. অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বললেনঃ ‘সেই সত্তার শপথ, যর হাতে আমার জীবন! যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূলের জন্য আপনাদের ভালবাসেনা তার অন্তরে ঈমানের নূর থাকবে না।’


একবার রাসূল সা. এক বৈঠকে আবু বকর ও উমারের রা. সাথে কথা বলছিলেন। এমন সময় আব্বাস উপস্থিত হলেন। রাসূল সা. তাঁকে নিজের ও আবু বকরের মাঝখানে বসালেন এবং কণ্ঠস্বর একটু নীচু করে কথা বলতে লাগলেন। আব্বাস চলে যাওয়ার পর আবু বকর রা. এমনটি করার কারণ জেজ্ঞেস করলেন। রাসূল সা. বলেনঃ ‘মর্যাদাবান ব্যক্তিই পারে মর্যাদাবান ব্যক্তির মর্যাদা দিতে।’ তিনি আরো বলেনঃ ‘জিবরীল আমাকে বলেছেন, আব্বাস উপস্থিত হলে আমি যেন আমার স্বর নিচু করি, যেমন আমার সামনে তোমাদের স্বর নিচু করার নির্দেশ তিনি দিয়েছেন।’


হযরত রাসূলে করীমের সা. পর পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীন হযরত আব্বাসের যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়েছেন। হযরত উমার ও হযরত উসমান রা. ঘোড়ার উপর সওয়ার হয়ে তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাঁর সম্মানার্থে ঘোড়া থেকে নেমে পড়তেন এবং বলতেনঃ ‘ইনি হচ্ছেন রাসূলুল্লাহর সা. চাচা।’ হযরত আবু বকর রা. একমাত্র আব্বাসকেই নিজে আসন থেকে সরে গিয়ে স্থান করে দিতেন।

হযরত আব্বাস ৩২ হিজরীর রজব/মুহাররম মাসের ১২ তারিখ ৮৮ (অষ্টাশি) বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান রা. জানাযার নামায পড়ান এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. কবরে নেমে তাঁকে সমাহিত করেন। মদীনার বাকী গোরস্তানে তাঁকে দাফন করা হয়। তিনি ইসলাম গ্রহণের পর ৩২ বছর এবং জাহিলী যুগে ৫৬ বছর জীবন লাভ করেন।

জাহিলী যুগে হযরত আব্বাস রা. অত্যন্ত সম্পদশালী ছিলেন। এ কারণে বদর যুদ্ধের সময় রাসূল সা. তাঁর নিকট থেকে মুক্তিপণ স্বরূপ বিশ উকিয়া স্বর্ণ গ্রহণ করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল তাঁর জীবিকার উৎস। সুদের কারবারও করতেন। মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত এ কারবার চালু ছিল। দশম হিজরীর বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক ভাষণে রাসূল সা. বলেনঃ ‘আজ থেকে আরবের সকল প্রকার সুদী কারবার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো এবং সর্বপ্রথম আমি আব্বাস ইবন আবদিল মুত্তালিবের সুদী কারবার রহিত ঘোষণা করছি।’

সুদের কারবার বন্ধ হওয়ার পর রাসূল সা. গণীমতের এক পঞ্চমাংশ ও ফিদাক বাগিচার আমদানী থেকে তাঁকে সাহায্য করতেন। রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর তিনি ও হযরত ফাতিমা প্রথম খলীফার নিকট রাসূলুল্লাহর সা. উত্তরাধিকার দাবী করেন। নবীরা কোন উত্তরাধিকার রেখে যান না- এ সম্পর্কিত রসূলুল্লাহর সা. একটি বাণী হযরত আবু বকরের রা. মুখ থেকে শোনার পর তাঁরা নীরব হয়ে যান।


হযরত আব্বাস ছিলেন অত্যন্ত দানশীল। অতিথি পরায়ণ ও দয়ালু। হযরত সাদ ইবন আবী ওয়াক্‌কাস রা. বলেনঃ ‘আব্বাস হলেন আল্লাহর রাসূলের চাচা, কুরাইশদের মধ্যে সর্বাধিক দরাজ হস্ত এবং আত্মীয় স্বজনের প্রতি অধিক মনোযোগী’। তিনি ছিলেন কোমল অন্তর বিশিষ্ট। দুআর জন্য হাত উঠালেই চোখ থেকে অশ্রুর বন্যা বয়ে যেত। এ কারণে তাঁর দুআয় এক বিশেষ আছর পরিলক্ষিত হতো।’

রাসূলুল্লাহ সা. আব্বাস রা. ও তাঁর সন্তানদের জন্য দুআ করেছেন। তিনি তাঁদের সকল প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অপরাধের মাগফিরাত কামনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সা. থেকে তিনি বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর থেকে বহু সাহাবী ও তাবেয়ী হাদীস বর্ণনা করেছেন।

হযরত আব্বাসের মধ্যে কাব্য প্রতিভাও ছিল। হুনাইন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তিনি একটি কবিতায় ব্যক্ত করেছেন। তার কয়েকটি পংক্তি ‘আল-ইসতিয়াব’ ও ইবন ইসহাকের সীরাত গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে।

লেখক: মুহাম্মাদ আব্দুল মা’বুদ

উৎস: আসহাবে রাসূলের জীবনকথা

অনুলিখন: এম.এ. ইমরান




collected from:  waytojannah.com

নিশিতে যাইও ফুলবনে রে ভোমরা | nishite jaio fulo bone | Nhrepon.com

নিশিতে যাইও ফুলবনে

- জসীমউদ্দীন
বাংলা কবিতা
নিশিতে যাইও ফুলবনে - জসীম উদ্দিন


নিশিতে যাইও ফুলবনে
রে ভোমরা
নিশিতে যাইও ফুলবনে।
জ্বালায়ে চান্দের বাতি
আমি জেগে রব সারা রাতি গো;
কব কথা শিশিরের সনে
রে ভোমরা!
নিশিতে যাইও ফুলবনে।



যদিবা ঘুমায়ে পড়ি-
স্বপনের পথ ধরি গো,
যেও তুমি নীরব চরণে
রে ভোমরা!
আমার ডাল যেন ভাঙে না,
আমার ফুল যেন ভাঙে না,
ফুলের ঘুম যেন ভাঙে না।
যেও তুমি নীরব চরণে
রে ভোমরা!
নিশিতে যাইও ফুলবনে।




কাব্যগ্রন্থ: রঙিলা নায়ের মাঝি







collected from : bangla-kobita.com

শিক্ষকের মর্যাদা - কাজী কাদের নেওয়াজ | Bangla kobita | Nhrepon.com

শিক্ষকের মর্যাদা

 কাজী কাদের নেওয়াজ




শিক্ষকের মর্যাদা
শিক্ষকের মর্যাদা



 বাদশাহ আলমগীর-
কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লীর।
একদা প্রভাতে গিয়া
দেখেন বাদশাহ- শাহজাদা এক পাত্র হস্তে নিয়া
ঢালিতেছে বারি গুরুর চরণে
পুলকিত হৃদে আনত-নয়নে,
শিক্ষক শুধু নিজ হাত দিয়া নিজেরি পায়ের ধুলি
ধুয়ে মুছে সব করিছেন সাফ্ সঞ্চারি অঙ্গুলি।

শিক্ষক মৌলভী

ভাবিলেন আজি নিস্তার নাহি, যায় বুঝি তার সবি।
দিল্লীপতির পুত্রের করে
লইয়াছে পানি চরণের পরে,
স্পর্ধার কাজ হেন অপরাধ কে করেছে কোন্ কালে!
ভাবিতে ভাবিতে চিন্তার রেখা দেখা দিল তার ভালে।

হঠাৎ কি ভাবি উঠি
কহিলেন, আমি ভয় করি না'ক, যায় যাবে শির টুটি,
শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার
দিল্লীর পতি সে তো কোন্ ছার,
ভয় করি না'ক, ধারি না'ক ধার, মনে আছে মোর বল,
বাদশাহ্ শুধালে শাস্ত্রের কথা শুনাব অনর্গল।
যায় যাবে প্রাণ তাহে,
প্রাণের চেয়েও মান বড়, আমি বোঝাব শাহানশাহে।

তার পরদিন প্রাতে
বাদশাহর দূত শিক্ষকে ডেকে নিয়ে গেল কেল্লাতে।
খাস কামরাতে যবে
শিক্ষকে ডাকি বাদশা কহেন, ''শুনুন জনাব তবে,
পুত্র আমার আপনার কাছে সৌজন্য কি কিছু শিখিয়াছে?

বরং শিখেছে বেয়াদবি আর গুরুজনে অবহেলা,
নহিলে সেদিন দেখিলাম যাহা স্বয়ং সকাল বেলা''
শিক্ষক কন-''জাহপানা, আমি বুঝিতে পারিনি হায়,
কি কথা বলিতে আজিকে আমায় ডেকেছেন নিরালায়?''

বাদশাহ্ কহেন, ''সেদিন প্রভাতে দেখিলাম আমি দাঁড়ায়ে তফাতে
নিজ হাতে যবে চরণ আপনি করেন প্রক্ষালন,
পুত্র আমার জল ঢালি শুধু ভিজাইছে ও চরণ।

নিজ হাতখানি আপনার পায়ে বুলাইয়া সযতনে
ধুয়ে দিল না'ক কেন সে চরণ, স্মরি ব্যথা পাই মনে।''


উচ্ছ্বাস ভরে শিক্ষকে আজি দাঁড়ায়ে সগৌরবে
কুর্ণিশ করি বাদশাহে তবে কহেন উচ্চরবে-
''আজ হতে চির-উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির,
সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর।''













আসমানী - জসীমউদ্দীন | Bangla kobita | Nhrepon.com

আসমানী

জসীম উদ্দীন

asmani-bangla-kobita
Bangla kobita asmani


জসীম উদ্দীন একজন বাঙালি কবি, গীতিকার, ঔপন্যাসিক ও লেখক।

জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯০৩ খ্রী:
মৃত্যু: ১৩ মার্চ ১৯৭৬ খ্রী:
পূর্ণনাম: মোহাম্মাদ জসীম উদ্দীন মোল্লা।
জন্মস্থান: ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন।
বাবার নাম: আনসার উদ্দীন মোল্লা। তিনি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন।
মায়ের নাম: আমিনা খাতুন ওরফে রাঙাছুট।
পারিবারিক পরিচিতি: তার বাবার বাড়ি ফরিদপুর জেলার গোবিন্দপুর গ্রামে।



asmani-bangla-kobita

পল্লীকবি জসীমউদ্দীন 'আসমানী' কবিতাটি ১৯৪৬ সালে রচনা করেন। কবিতাটি ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত কবির 'এক পয়সার বাঁশী' কাব্য গ্রন্থে স্থান পায়।






আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।

একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,
তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।
পেটটি ভরে পায় না খেতে, বুকের ক-খান হাড়,
সাক্ষী দিছে অনাহারে কদিন গেছে তার।

মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি
থাপড়েতে নিবিয়ে দেছে দারুণ অভাব আসি।
পরনে তার শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস,
সোনালি তার গা বরণের করছে উপহাস।

ভোমর-কালো চোখ দুটিতে নাই কৌতুক-হাসি,
সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু রাশি রাশি।
বাঁশির মতো সুরটি গলায় ক্ষয় হল তাই কেঁদে,
হয় নি সুযোগ লয় যে সে-সুর গানের সুরে বেঁধে।

আসমানীদের বাড়ির ধারে পদ্ম-পুকুর ভরে
ব্যাঙের ছানা শ্যাওলা-পানা কিল্-বিল্-বিল করে।
ম্যালেরিয়ার মশক সেথা বিষ গুলিছে জলে,
সেই জলেতে রান্না-খাওয়া আসমানীদের চলে।

পেটটি তাহার দুলছে পিলেয়, নিতুই যে জ্বর তার,
বৈদ্য ডেকে ওষুধ করে পয়সা নাহি আর।





আবৃত্তি দেখতে ভিডিওতে ক্লিক করুন।

আবৃত্তি করেছেন: তাহিরা তাবাস্সুম

সংগ্রহ করা হয়েছে বাংলা কবিতা.কম  এবং আলকামা.কম থেকে।

ইমাম আবু হানিফা রহঃ এর জীবনী | Nhrepon.com

ইমাম আবু হানিফা রহঃ

Imam-abu-hanifa
ইমাম আবু হানিফা (র:) এর জীবনী

ভূমিকা

যুগে যুগে যে সকল মণীষীরা এ ধরাপৃষ্ঠে আগমন করেছিলেন তাদের মাঝে ইমাম আবু হানিফা রহঃ ছিলেন অন্যতম।

জন্ম ও বংশ পরিচয়:
তার পূর্ণ নাম হল- আবু হানীফা আন নু’মান ইবনি সাবিত নোমান {যুতি বা যাওতী } ইবনে মুরযেবান । প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী ইমাম আবু হানিফা ইরাকের কুফায় ৫ সেপ্টেম্বর ৬৯৯ ইংরেজী মোতাবেক ৮০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান এর বায়োগ্রাফি.


দুধ বিক্রির জমানো ৮ টাকা দিয়ে পান-বিড়ির দোকান দেই!

আতিউর রহমান
আতিউর রহমান

একটা গাভী আর কয়েকটা খাসি আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা
পর্যন্ত ওগুলো মাঠে চরাতাম। বিকেল বেলা গাভীর দুধ নিয়ে বাজারে গিয়ে
বিক্রি করতাম। দুধ বিক্রির আয় থেকে সঞ্চিত আট টাকা দিয়ে আমি পান-বিড়ির
দোকান দেই।
আমার জন্ম জামালপুর জেলার এক অজপাড়াগাঁয়ে। ১৪ কিলোমিটার দূরের শহরে
যেতে হতো পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে চড়ে। পুরো গ্রামের মধ্যে একমাত্র মেট্রিক
পাস ছিলেন আমার চাচা মফিজউদ্দিন। আমার বাবা একজন অতি দরিদ্র ভূমিহীন কৃষক।
আমরা পাঁচ ভাই, তিন বোন। কোনরকমে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতো আমাদের।
আমার দাদার আর্থিক অবস্থা ছিলো মোটামুটি। কিন্তু তিনি আমার বাবাকে তাঁর
বাড়িতে ঠাঁই দেননি। দাদার বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে একটা ছনের ঘরে আমরা
এতগুলো ভাই-বোন আর বাবা-মা থাকতাম।
মা তাঁর বাবার বাড়ি থেকে নানার সম্পত্তির সামান্য অংশ পেয়েছিলেন। তাতে
তিন বিঘা জমি কেনা হয়। চাষাবাদের জন্য অনুপযুক্ত ওই জমিতে বহু কষ্টে বাবা
যা ফলাতেন, তাতে বছরে ৫/৬ মাসের খাবার জুটতো। দারিদ্র্য কী জিনিস, তা আমি
মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি- খাবার নেই, পরনের কাপড় নেই; কী এক অবস্থা !
আমার মা সামান্য লেখাপড়া জানতেন। তাঁর কাছেই আমার পড়াশোনার হাতেখড়ি।
তারপর বাড়ির পাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। কিন্তু আমার পরিবারে
এতটাই অভাব যে, আমি যখন তৃতীয় শ্রেণীতে উঠলাম, তখন আর পড়াশোনা চালিয়ে
যাওয়ার সুযোগ থাকলো না। বড় ভাই আরো আগে স্কুল ছেড়ে কাজে ঢুকেছেন। আমাকেও
লেখাপড়া ছেড়ে রোজগারের পথে নামতে হলো।
আমাদের একটা গাভী আর কয়েকটা খাসি ছিল। আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত
ওগুলো মাঠে চরাতাম। বিকেল বেলা গাভীর দুধ নিয়ে বাজারে গিয়ে বিক্রি করতাম।
এভাবে দুই ভাই মিলে যা আয় করতাম, তাতে কোনরকমে দিন কাটছিল।
কিছুদিন চলার পর দুধ বিক্রির আয় থেকে সঞ্চিত আট টাকা দিয়ে আমি
পান-বিড়ির দোকান দেই। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানে বসতাম।
পড়াশোনা তো বন্ধই, আদৌ করবো- সেই স্বপ্নও ছিল না !
এক বিকেলে বড় ভাই বললেন, আজ স্কুল মাঠে নাটক হবে। স্পষ্ট মনে আছে, তখন
আমার গায়ে দেওয়ার মতো কোন জামা নেই। খালি গা আর লুঙ্গি পরে আমি ভাইয়ের
সঙ্গে নাটক দেখতে চলেছি।
স্কুলে পৌঁছে আমি তো বিস্ময়ে হতবাক ! চারদিকে এত আনন্দময় চমৎকার
পরিবেশ ! আমার মনে হলো, আমিও তো আর সবার মতোই হতে পারতাম। সিদ্ধান্ত নিলাম,
আমাকে আবার স্কুলে ফিরে আসতে হবে।
নাটক দেখে বাড়ি ফেরার পথে বড় ভাইকে বললাম, আমি কি আবার স্কুলে ফিরে
আসতে পারি না ? আমার বলার ভঙ্গি বা করুণ চাহনি দেখেই হোক কিংবা অন্য কোন
কারণেই হোক কথাটা ভাইয়ের মনে ধরলো। তিনি বললেন, ঠিক আছে কাল হেডস্যারের
সঙ্গে আলাপ করবো।
পরদিন দুই ভাই আবার স্কুলে গেলাম। বড় ভাই আমাকে হেডস্যারের রুমের বাইরে
দাঁড় করিয়ে রেখে ভিতরে গেলেন। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট শুনছি, ভাই
বলছেন আমাকে যেন বার্ষিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগটুকু দেওয়া হয়।
কিন্তু হেডস্যার অবজ্ঞার ভঙ্গিতে বললেন, সবাইকে দিয়ে কি লেখাপড়া হয়!
স্যারের কথা শুনে আমার মাথা নিচু হয়ে গেল।
যতখানি আশা নিয়ে স্কুলে গিয়েছিলাম, স্যারের এক কথাতেই সব ধুলিস্মাৎ
হয়ে গেল। তবু বড় ভাই অনেক পীড়াপীড়ি করে আমার পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি
যোগাড় করলেন। পরীক্ষার তখন আর মাত্র তিন মাস বাকি।
বাড়ি ফিরে মাকে বললাম, আমাকে তিন মাসের ছুটি দিতে হবে। আমি আর এখানে
থাকবো না। কারণ ঘরে খাবার নেই, পরনে কাপড় নেই- আমার কোন বইও নেই, কিন্তু
আমাকে পরীক্ষায় পাস করতে হবে।
মা বললেন, কোথায় যাবি ? বললাম, আমার এককালের সহপাঠী এবং এখন ক্লাসের
ফার্স্টবয় মোজাম্মেলের বাড়িতে যাবো। ওর মায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। যে
ক’দিন কথা বলেছি, তাতে করে খুব ভালো মানুষ বলে মনে হয়েছে। আমার বিশ্বাস,
আমাকে উনি ফিরিয়ে দিতে পারবেন না।
দুরু দুরু মনে মোজাম্মেলের বাড়ি গেলাম। সবকিছু খুলে বলতেই খালাম্মা
সানন্দে রাজি হলেন। আমার খাবার আর আশ্রয় জুটলো; শুরু হলো নতুন জীবন। নতুন
করে পড়াশোনা শুরু করলাম। প্রতিক্ষণেই হেডস্যারের সেই অবজ্ঞাসূচক কথা মনে
পড়ে যায়, জেদ কাজ করে মনে; আরো ভালো করে পড়াশোনা করি।
যথাসময়ে পরীক্ষা শুরু হলো। আমি এক-একটি পরীক্ষা শেষ করছি আর ক্রমেই যেন
উজ্জীবিত হচ্ছি। আমার আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যাচ্ছে। ফল প্রকাশের দিন আমি
স্কুলে গিয়ে প্রথম সারিতে বসলাম। হেডস্যার ফলাফল নিয়ে এলেন।
আমি লক্ষ্য করলাম, পড়তে গিয়ে তিনি কেমন যেন দ্বিধান্বিত। আড়চোখে আমার
দিকে তাকাচ্ছেন। তারপর ফল ঘোষণা করলেন। আমি প্রথম হয়েছি ! খবর শুনে বড়
ভাই আনন্দে কেঁদে ফেললেন। শুধু আমি নির্বিকার- যেন এটাই হওয়ার কথা ছিল।
বাড়ি ফেরার পথে সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। আমি আর আমার ভাই গর্বিত ভঙ্গিতে
হেঁটে আসছি। আর পিছনে এক দল ছেলেমেয়ে আমাকে নিয়ে হৈ চৈ করছে, স্লোগান
দিচ্ছে। সারা গাঁয়ে সাড়া পড়ে
নিয়ে এসে আমাকে দেখালেন। ওইটা ছিল ক্যাডেট কলেজে ভর্তির বিজ্ঞাপন।
যথাসময়ে ফরম পুরণ করে পাঠালাম। এখানে বলা দরকার, আমার নাম ছিল আতাউর
রহমান।
কিন্তু ক্যাডেট কলেজের ভর্তি ফরমে স্কুলের হেডস্যার আমার নাম আতিউর
রহমান লিখে চাচাকে বলেছিলেন, এই ছেলে একদিন অনেক বড় কিছু হবে। দেশে অনেক
আতাউর আছে। ওর নামটা একটু আলাদা হওয়া দরকার; তাই আতিউর করে দিলাম।
আমি রাত জেগে পড়াশোনা করে প্রস্তুতি নিলাম। নির্ধারিত দিনে চাচার সঙ্গে
পরীক্ষা দিতে রওনা হলাম। ওই আমার জীবনে প্রথম ময়মনসিংহ যাওয়া। গিয়ে
সবকিছু দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ ! এত এত ছেলের মধ্যে আমিই কেবল পায়জামা আর
স্পঞ্জ পরে এসেছি !
আমার মনে হলো, না আসাটাই ভালো ছিল। অহেতুক কষ্ট করলাম। যাই হোক পরীক্ষা
দিলাম; ভাবলাম হবে না। কিন্তু দুই মাস পর চিঠি পেলাম, আমি নির্বাচিত
হয়েছি। এখন চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে যেতে হবে।
সবাই খুব খুশি; কেবল আমিই হতাশ। আমার একটা প্যান্ট নেই, যেটা পরে যাবো।
শেষে স্কুলের কেরানি কানাই লাল বিশ্বাসের ফুলপ্যান্টটা ধার করলাম। আর একটা
শার্ট যোগাড় হলো।
আমি আর চাচা অচেনা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম। চাচা শিখিয়ে দিলেন, মৌখিক
পরীক্ষা দিতে গিয়ে আমি যেন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলি: ম্যা আই কাম ইন
স্যার ? ঠিকমতোই বললাম। তবে এত উচ্চস্বরে বললাম যে, উপস্থিত সবাই হো হো করে
হেসে উঠলো।
পরীক্ষকদের একজন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ এম. ডাব্লিউ. পিট
আমাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে সবকিছু আঁচ করে ফেললেন। পরম স্নেহে তিনি
আমাকে বসালেন। মুহূর্তের মধ্যে তিনি আমার খুব আপন হয়ে গেলেন। আমার মনে
হলো, তিনি থাকলে আমার কোন ভয় নেই।
পিট স্যার আমার লিখিত পরীক্ষার খাতায় চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর অন্য
পরীক্ষকদের সঙ্গে ইংরেজিতে কী-সব আলাপ করলেন। আমি সবটা না বুঝলেও আঁচ করতে
পারলাম যে, আমাকে তাঁদের পছন্দ হয়েছে।
তবে তাঁরা কিছুই বললেন না। পরদিন ঢাকা শহর ঘুরে দেখে বাড়ি ফিরে এলাম।
যথারীতি পড়াশোনায় মনোনিবেশ করলাম। কারণ আমি ধরেই নিয়েছি, আমার চান্স হবে
না।
হঠাৎ তিন মাস পর চিঠি এলো। আমি চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছি। মাসে ১৫০
টাকা বেতন লাগবে। এর মধ্যে ১০০ টাকা বৃত্তি দেওয়া হবে, বাকি ৫০ টাকা আমার
পরিবারকে যোগান দিতে হবে।
চিঠি পড়ে মন ভেঙে গেল। যেখানে আমার পরিবারের তিনবেলা খাওয়ার নিশ্চয়তা
নেই, আমি চাচার বাড়িতে মানুষ হচ্ছি, সেখানে প্রতিমাসে ৫০ টাকা বেতন
যোগানোর কথা চিন্তাও করা যায় না !
এই যখন অবস্থা, তখন প্রথমবারের মতো আমার দাদা সরব হলেন। এত বছর পর নাতির
(আমার) খোঁজ নিলেন। আমাকে অন্য চাচাদের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, তোমরা
থাকতে নাতি আমার এত ভালো সুযোগ পেয়েও পড়তে পারবে না ?
কিন্তু তাঁদের অবস্থাও খুব বেশি ভালো ছিল না। তাঁরা বললেন, একবার না হয়
৫০ টাকা যোগাড় করে দেবো, কিন্তু প্রতি মাসে তো সম্ভব নয়। দাদাও বিষয়টা
বুঝলেন।
আমি আর কোন আশার আলো দেখতে না পেয়ে সেই ফয়েজ মৌলভী স্যারের কাছে
গেলাম। তিনি বললেন, আমি থাকতে কোন চিন্তা করবে না। পরদিন আরো দুইজন সহকর্মী
আর আমাকে নিয়ে তিনি হাটে গেলেন।
সেখানে গামছা পেতে দোকানে দোকানে ঘুরলেন। সবাইকে বিস্তারিত বলে সাহায্য
চাইলেন। সবাই সাধ্য মতো আট আনা, চার আনা, এক টাকা, দুই টাকা দিলেন। সব
মিলিয়ে ১৫০ টাকা হলো।
আর চাচারা দিলেন ৫০ টাকা। এই সামান্য টাকা সম্বল করে আমি মির্জাপুর
ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হলাম। যাতায়াত খরচ বাদ দিয়ে আমি ১৫০ টাকায় তিন
মাসের বেতন পরিশোধ করলাম। শুরু হলো অন্য এক জীবন।
প্রথম দিনেই এম. ডাব্লিউ. পিট স্যার আমাকে দেখতে এলেন। আমি সবকিছু খুলে
বললাম। আরো জানালাম যে, যেহেতু আমার আর বেতন দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাই তিন
মাস পর ক্যাডেট কলেজ ছেড়ে চলে যেতে হবে।
সব শুনে স্যার আমার বিষয়টা বোর্ড মিটিঙে তুললেন এবং পুরো ১৫০ টাকাই
বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিলেন। সেই থেকে আমাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
এস.এস.সি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে পঞ্চম স্থান অধিকার করলাম এবং আরো অনেক
সাফল্যের মুকুট যোগ হলো।
আমার জীবনটা সাধারণ মানুষের অনুদানে ভরপুর। পরবর্তীকালে আমি আমার
এলাকায় স্কুল করেছি, কলেজ করেছি। যখন যাকে যতটা পারি, সাধ্যমতো সাহায্য
সহযোগিতাও করি। কিন্তু সেই যে হাট থেকে তোলা ১৫০ টাকা; সেই ঋণ আজও শোধ
হয়নি। আমার সমগ্র জীবন উৎসর্গ করলেও সেই ঋণ শোধ হবে না!



collected from uddoktarkhoje.com

বেহেশতি জেওর । পর্ব - ০১

হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানাআশরাফ আলী থানভী (রঃ)

বংশ পরিচয়ঃ

আগ্রা-আয়োধ্যা যুক্তপ্রদেশের মুজাফফর নগর জিলার অন্তগত প্রসিদ্ধ শহর থানাভবনে ফারূকী বংশের চারটি গোত্রের লোক বসবাস করিতেন।তন্মধ্যে খতিব গোত্রই ছিল অন্যতম। থানাভবনে সুলতান শিহাব উদ্দিন ফাররূখ-শাহ্ কাবুলি ছিলেন হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশ্রাফ আলী থানভীর উধ্বতন পুরুষ। থানাভবনে
এই বংশে বিশিষ্ট বুযুর্গ ও ওলিয়ে কামেলগণ জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। সুতারাং হযরত থানভীর পিতা হইলেন ফারুকী। হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী, শায়খ জালালুদ্দিন থানেশ্বরী, শায়খ ফরীদুদ্দীন গন্জেশকর প্রমুখ খ্যাতনামা বুযুর্গগণ এই বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। হযরত মাওলানা থানভী (রঃ)-এর পিতা জনাব মুন্সি আব্দুল হক ছাহেব ছিলেন একজন প্রবাবশালী বিত্তবান লোক। তিনি খ্যাতনামা দানশীল ব্যক্তি এবং ফার্সী ভাষায় একজন উচ্চস্তরের পন্ডিত ছিলেন।এতদ্ভিন্ন তিনি একজন বিচক্ষণ, দূরদর্শি এবং উচ্চ শ্রেণীর সাধক ছিলেন।

তাঁহার মাতৃকুল ছিল ‘আলভী’ অর্থাৎ হযরত আলীর বংশধর। হযরত মাওলানা থানভীর জননী চিলেন একজন দ্বীনদার এবং আল্লাহর ওলী।উচ্চস্তরের বুযুর্গ ও ওরিয়ে কামেল পীরজী এমদাদ আলী ছাহেব ছিলেন তঁহার মাতুল। তাহার মাতা মহ (নানা) মীর নজাবত আলী ছাহেব ছিলেন ফার্সী ভাষায় সুপন্ডিত ও লব্ধপ্রতিষ্ট প্রবন্ধকার। প্রত্যুপন্নমতিত্ব ছিল তার একটি গুণ। তিনি মাওলানা শাহ্ নেয়ায আহম্মদ বেরলভীর জনৈক বিশিষ্ট খলীফার মুরীদ ছিলেন।খ্যাতনামা বুযুর্গ হাফেজ মোর্তাজা চাহেবের সহিতও তাহার আধ্যাত্নিক যোগ সম্পর্ক ছিলো বলিয়া তিনি বেলায়তের দরজায় পৌঁছেন। এমন উচ্চ মযাদাশীল পার্থিব ঐশ্বর্যে ধনবান, সাথে সাথে ধর্মপরায়নতা সহিত নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিলেন, এমন একটি সম্ভ্রান্ত ও প্রখ্যাত বংশে হাকিমুল উম্মত, মুজাদ্দিদে মিল্লাত, জামেয়ে শরীয়ত, বেদআত ও রুসুমাৎ এর মুল উৎপাটনকারী শাহ্ ছুফী হাজী হাফেয হযরত মাওরানা আশরাফ আলী খানভী চিশতী হানাফী জন্মগ্রহণ করেন। হযরত মাওলানা ছিলেন দুরদর্শী, দৃঢ়চেতা, সূক্ষ্মদর্শী, স্বাবলম্বী, সত্যপ্রিয়, খোদাভীরু, ন্যায়পরায়ন প্রভূতি মানবীয় গুণে গুনান্বিত। এই মহৎ গুণাবলি তিনি হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) হইতে পৈতৃকসূত্রে লাভ করিয়াছিলেন। আর মা’রেফাত বা আধ্যাত্নিকরুপ অমুল্য রত্ন লাভ করেন মাতৃকুল অর্থাৎ, হযরত আলী (রাঃ) হইতে।

জন্ম বৃত্তান্তঃ

হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা থানভীর জন্ম বৃত্তান্ত অলৌকিক ঘঠনার সহিত জড়িত। তাহার পিতার কোন পুত্রসন্তান জীবিত থাকিত না। তদুপরি তিনি এক দুরারোগ্য আক্রান্ত হইয়া চিকিৎসকদের পরামর্শে এমন এক ঔষদ সেবন করেন যাতে তাহার প্রজনন ক্ষমতা সম্পূর্ণ রূপে রহিত হইয়া যায় । ইহাতে হাকীমুল উম্মতের মাতামহী নেহায়েত বিচলিত হইয়া পড়েন।একদা তিনি হাফেজ গোলাম মোর্তজা ছাহেব পনিপতির খেদমতে এ বিষয়টি আরজ করেন। হাফেজ ছাহেব ছিলেন মজযুব। তিনি বলিলেনঃ “ওমর ও আলীর টানাটানিতেই পুত্র-সন্তানগুলি মারা যায়।এবার পুত্র-সন্তান জন্মিলে হযরত আলীর সোপর্দ করিয়া দিও। ইনশাআল্লাহ জীবিত থাকিবে।” তাঁহার এ্ই হেঁয়ালী কেহই বুঝিতে পারিলেন না। পূর্ণ কথার সারমর্ম একমাত্র মাওলানার বুদ্ধিমতি জননীই বুঝিলেন আর তিনি বলিলেন, হাফেজ ছাহেবের কথার অর্থ সম্ববতঃ এই যে, ছেলেদের পিতৃকুল ফারূকী, আর ইম হযরত আলী (রাঃ) এর বংশধর। এযাবৎ পুত্রসন্তানদের নাম রাখা হয়ে ছিলো পিতার নামানুকরনে, অর্থাৎ হক শব্দ যোগে রাখা হইয়াছিলো।যেমন আব্দুল হক, ফজলে হক ইত্যাদি । এবার পুত্র সন্তান জন্মিলে মাতৃকুল অনযায়ী নাম রাখিতে। অথ্যাৎ আমার উর্ধ্বতন আদি পুরুষ হযরত আলী (রাঃ) এর নামের সহিত মিল রাখিয়া নামানুকরণ এর বলিতেছেন। ইহা শুনিয়া হাফেজ সাহেব সহাস্যে বলিয়া উঠিলেন, বাহবা ! মেয়েটি বড়ই বুদ্ধিমতি বলিয়া মনে হয়। আমার উদ্দেশ্য ইহাই ছিল। ইহার গর্ভে 2টি ছেলে হইবে। ইনশাআল্লাহ উভয় বাচিয়া থাকিবে এবং ভাগ্যবান হইবে। একজনের নাম রাখিবে আশ্রাফ আলী অপর জনের নাম রাখিবে আকবর আলী। একজন হইবে আমার অনুসারী, সে হিইবে আলেম ও হাফেজ। অপর জন হইবে দুনিয়াদার বস্তুত ঃ তাহাই হইয়া ছিল। আল্লাহ পাক কে বুজুর্গের দ্বারা হযরত থানবী মাতৃ-গর্ভে আসার পূর্বে অথ্যাৎ আলমে আরওয়াহে থাকাকালীন তাহার নাম রাখাইয়া দিলেন।আল্লাহ পাকের কত বড় মেহেরবানী কত বড় সৌভাগ্যের কথা।

জন্ম :

হিজরী ১২৮০ সনের ৫ই রবিউস সানী বুধবার ছোবহে ছাদেকের সময় হাকীমুল উম্মত জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন। হাফেজ গোলাম মর্তুজা সাহেবের নির্দেশ ক্রমে নবজাতের নাম রাখা হল আশ্রাফ আলী। তাহার জন্মের ১৪ মাস পরে তাহার ছোট ভাই আকবর আলীর জন্ম হয়। থানা ভবনের অধিবাসী বলিয়া তাঁহাকে থানবী বলিয়া অবহিত করা হয়।

বাল্যকাল ঃ

মাওলানার পাঁচ বছর বয়স কালে তাঁহার পূণ্যশীলা স্নেহময়ী জননী পরলোক গমন করেন। শিশুকালেই দুই ভাই মাতৃস্নেহ হইতে বঞ্চিত হইলেন। কিন্তু পিতা জননীর ন্যায় স্নেহ মমতায় উভয় শিশুর লালন পালন ও তালীম তবিয়তের ব্যবস্থা করিতে লাগিলেন। তিনি উভয়কেই কুবই স্নেহ করিতেন। স্বহস্তে গোসল করাইতেন, স্বহস্তে খাওয়াইতেন। পিতার অত্যাধিক আদর যত্নের কারণে শিশুরা মায়ের বিচ্ছেদ-বেদনার কথা কখনও অনুভব করিতেই পারে নাই।

শৈশব হইতেই হযরত হাকীমুল উম্মতের চাল-চলন ও আচার-ব্যবহার ছিল পাক পবিত্র ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। তিনি কখনও বাহিরের ছেলেদের সহিত খেলাধুলা করিতেন না। ছোট ভাই আকবর আলীকে নিয়া নিজ বাড়ীর সীমার মধ্যে খেলাধুলা করিতেন। খেলা ধুলার সময় ধুলাবালি গায়ে ও কাপড়ে লাগিতে দিতেন না। সময়ে বৃষ্টিতে ভিজিয়া উভয় ভ্রাতা আনন্দ উপভোগ করিতেন। হযরত মাওলানা বাল্যকালে নেহায়েত শান্ত ও সুশীল ছিলেন। তাহার সু-মধুর ব্যভহারে বিধর্মীরাও তাঁহাকে অত্যান্ত স্নেহের চোখে দেখিত।

সাধারণত: ছেলেরা মসজিদে বা উৎসব উপলক্ষে শিরনী মিঠাই ইত্যাদি পাইবার সুযোগ গ্রহণ করে। হযরত মাওলানার বিচক্ষন ও দূরদর্শী পিতা ইহা আদৌ পচন্দ করিতেন না। তিনি বরং বাজার থেকে মিঠাই আনিয়া দুই পুত্রের হাতে দিয়া বলিতেন, মিঠাইয়ের জন্য মসজিদে যাওয়া বড়ই লজ্জার কথা। হযরত হাকীমৃল উম্মতের মেধাশক্তিও ছিল অসাধারণ। বিদ্যালয়ের দৈনিন্দিনের পাঠ সহজেই কন্ঠস্থ করিয়া ফেলিতেন। কাজেই পিতা বা ওস্তাদগণ কেহই তাঁহাকে তিরস্কার বা ভর্ৎসনা করার সুযোগ পাইতেন না; বরং ওস্তাদগলণ তাঁহাকে আন্তরিক স্নেহ করিতেন। তিনি ধর্ম কর্মে অত্যান্ত অনুরাগী ছিলেন। এজন্য জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই তাঁহাকে স্নেহ করিত। কেহই তাঁহার কাজের প্রতিবাধ করিতোনা। এমনকি অসন্তুষ্টিও প্রকাশ করিতোনা। দেওয়ালী পুজার মিরাটের চাওনী বাজারের রাস্তার দুই ধারে সারি বাঁধিয়া অসংখ্য প্রদীপ জালান হইত। তাহারা দুই ভাই রুমালের সাহায্যে বাতাস দিয়া একাধারে সকল প্রদীপ নিবাইয়া দিতেন। এজ্য কেহই তাঁহাদের কিছু বলিতো না; এমনকি হিন্দুরাও কিছু বলিতোনা। তিনি খেলার মধ্যে নামাজের অভিনয় করিতেন। সহপাঠীদের জুতা গুলিকে কেবলা মুখি সারি করিয়া সাজাইতেন এবং একটি জুতা সারির সম্মুখে স্থাপন করিয়া সঙ্গীদেরকে বলিতেন, দেখ, দেখ, জুতাও জামাতে নামাজ পড়ে। এই বলিয়া বেশ আনন্দ উপভোগ করিতেন। ইহাতে বুঝা যায়, জামাতে নামাজ পড়ার প্রতি তাঁহার অন্তরে কত আকর্ন ও ভালবাসা ছিল। তিনি খেলাধুলায় অযথা সময় নষ্ট করিতেন না। বরং দোয়া দরুদ পড়িতে থাকিতেন।

তাঁহার বয়স যখন ১২/১৩ বৎসর তখন তিনি শেষ রাত্রে উঠিয়া তাহাজ্জুদের নামাজ পড়িতেন। গভীর রাত্রে একাকি নামাজ পড়িতে দেখিয়া তাঁহার চাচি আম্মা বলিতেন, তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার সময় তোমার এখনও হয় নাই, বড় হইলে পড়িবে। ইহাতে কোন ফল হইল না; বরং তিনি রীতিমত তাহাজ্জুদের নামাজ পড়িতে রহিলেন। চাচী আম্মা নিরুপাই হইয়া তাহাজ্জুদ নামাজে মশগুল থাকা কারীন তাহাকে পাহারা দিতেন। কারণ, ছেলে মানুষ গভীর রাত্রে একাকি ভয় পাইতে পারে।

ছোট বেলা হইতেই তিনি ওয়ায বা বক্তৃতা করিতে অভ্যস্ত ছিলেন। সময় সময় সওদা আনিবার জন্য তাঁহাকে বাজারে যাইতে হইতো।পেথি মধ্যে কোন মসজিদ দেখিতে পাইলে ইহাতে ডুকিয়া পড়িতেন এবং মিম্বারে দাড়াইয়া খোৎবার ন্যায় কিছু পড়িতেন। অথবা কিছু ওয়াজ নছিহত করিতেন। এরুপে তিনি ছোট বেলাই ওয়াজের ক্ষমতা অর্জন করিতে সক্ষম হন। ফলে তিনি উত্তর কালে বিখ্যাত ওয়ায়েজ বলিয়া প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

হযরত হাকীমুল উম্মত যখন সবে মাত্র মক্তবের ছাত্র তখন কুত্‌বুল আকতাব হযরত মিয়াজী নুর মোহাম্মদ ছাহেবের খাছ খলিফা হযরত শায়খ মুহাম্মদ মুহাদ্দেস (ইনি হাজী ইমদাদুল্যাহ মুহাজিরে মক্কীর পীর-ভাই) বলিতেন। এই বালক উত্তর কালে আমার স্থলাভিষিক্ত হইবে। হযরত হাকীমুল উম্মত বালকালে যখন গৃহের বাহিরে যাইতেন, তখন আকাশের মেঘ মালা তাঁহাকে ছায়া দিত। আল্লাহর ওলী এবং যথার্থ অর্থে “নায়েবে রসূল” হওয়ার ইহাই একটি উজ্জল নিদর্শন।

একটি স্বপ্ন :

হযরত হাকীমুল উম্মত বাল্যকালে একটি তাৎপর্য পূর্ণ স্বপ্ন দেখেন। তিনি বলেন, স্বপ্নে আমি দেখিলাম, আমি মীরাটের যেই বাড়ীতে থাকিতাম ইহাতে উঠিবার দুইটি সিঁড়ি ছিল, একটি বড় একটি ছোট। আমি দেখিলাম, বড় সিঁড়িটির একটি পিঞ্জিরায় দুইটি সুন্দর কবুতর। অতঃপর যেন চারিদিকে সন্ধার অন্ধকারে ছাইয়া গেল। তখন কবুতর দুইটি আমাকে লক্ষ করিয়া বলিলঃ আমাদের পিঞ্জিরাটিকে আলোকিত করিয় দিন। উত্তরে আমি বলিলাম, তোমরা নিজে রাই আলোকিত করিয়া লও। তখন কবুতর দ্বয় নিজেদের ঠোঁট পিঞ্জিরার সহিত ঘর্ষন করিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে খাঁচাটি এক উজ্জ্বল আলোকে আলোকিত হইয়া গেল।

কিছুদিন পর এই স্বপ্নেরস কথা তিনি তাঁহার মামা ওয়াজেদ আলী সাহেবের নিকট ব্যক্ত করিলে তিনি ইহার তা’বীর এই করিলেন যে, কবুতর দুইটি হইল ‘রুহ’ অপরটি ‘নফস’ মোজাহাদা বা সাধ্য-সাধনার মাধ্যমে তাহাদিগকে নূরানী করিতে আবেদন করিয়াছিল। কিন্তু তোমার কথায় তাহারা নিজেরাই নিজেদেরকে নুরানী করিয়া লইল। ইহাতে বুঝা যায়-যিয়াযত ও মোজাহাদা ব্যতিরেকেই আল্লাহ পাক তোমার রুহ ও নফ্সকে উজ্জ্বল করিয়া দিবেন। কালে এই স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হইয়অছিল। শৈশব হইতেই তিনি ছিলেন নাযুক তবিয়তের। তিনি কাহারো নগ্ন পেট দেখিতে পারিতেন না। অনাবৃত পেট দেখা মাত্র বমি হইয়া যাইত। যে গৃহে কোন প্রকার তীব্র সুগন্ধ থাকিত তথায় তিনি ঘুমাইতে পারিতেন না আর দূর্গন্ধের তো কোন কথাই নাই। কোন জিনিস এলোমেলো দেখিলেই তৎক্ষণাৎ তাঁহার মাথা ব্যথা আরম্ভ হইয়া যাইত।

শিক্ষা ব্যবস্থা :

হযরত মাওলানা থানবী (র:) কোরআন মজীদও প্রাথমিক উর্দূ, ফার্সী কিতাব মীরাটে শিক্ষা লাভ করেন। পরে থানা ভবন আসিয়া তদীয় মাতুল ওয়াজেদ আলী সাহেবের নিকট শিক্ষা লাভ করেন। অতপর আরবীতে উচ্চ শিক্ষালাভের জন্য ১২৯৫ হিজরীতে বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “দেওবন্দ দারুল উলূম মাদ্রাসায়” গমন করেন। মাত্র ৫বৎসরেই দেওবন্ধের শিক্ষা সমাপ্ত করিয়া দেশে প্রত্যাগমন করেন। তখন তাঁহার বয়স ছিলি মাত্র 19 বৎসর। এই সময়ের মধ্যে এলমে হাদীস, এলমে তফসীর, আরবী সাহিত্য, অলংকার শাস্ত্র, সূক্ষ্ম তত্ত্বজ্ঞান শাস্ত্র, সৌরবিজ্ঞান, দর্শন শাস্ত্র, ইসলামী আইন শাস্ত্র, নৈতিক চরিত্র বিজ্ঞান, মসস্তত্ত্ববিজ্ঞান, মূলনীতি শাস্ত্র, প্রকৃতি বিজ্ঞান, উদ্ভিদ ও প্রাণী বিজ্ঞান, ইতিহাস ও যুক্তি বিজ্ঞান,আধ্যাত্মিক ও চিকিৎসা বিজ্ঞান ইত্যাদি বাইশটি বিষয়ের জটিল কিতাব সমূহ অতি কৃতিত্বের সহিত অধ্যয়ন করেন। এ সময় তিনি “জের ও বম” নামে একটি ফার্সি কাব্য রচনা করেন।

দেওবন্দে দুইটি স্বপ্নঃ

১. একবার তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, িএকটি কুপ হইতে রৌপ্য শ্রোত প্রবাহিত হইয়া তাঁহার পিছনে পিছনে ধাবিত হইতেছে।

২. আর একবার তিনি স্বপ্নে দেখেন জনৈক বুযুর্গ ও কোনে এক দেশের গভর্ণর, এই দুই ব্যক্তি তাঁহাকে দুইখানা পত্র লেখেন। উভয় পত্রেই লেখা ছিল যে, আমরা আপনাকে মর্যাদা প্রদান করিলাম” । ঐ পত্রের একটিতে হযরত নবী করীম (সাঃ) এর নামের মোহর অঙ্কিত ছিল। উহার লেখাটি বেশ স্পষ্ট ও সুন্দর ছিল। অপর পত্রের মোহরের ছাপ অস্পষ্ট থাকায় পড়া যাইতেছিল না। হযরত মাওলানা এই উভয় স্বপ্ন দেওবন্দের প্রধান অধ্যক্ষ ও পরম শ্রদ্ধেয় ওস্তাদ হযরত মাওলানা ইয়াকুব ছাহেবের নিকট ব্যক্ত করেন। প্রথম স্বপ্নের তা’বীরে মাওলানা বলিলেন, দুনিয়ার ধন-দৌলত তোমার পায়ে লুটাইয়া পড়িবে, অথচ তুমি সেদিকে ভ্রূক্ষেপও করিবেনা। দ্বিতী স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বলিলেন। ইনশাআল্লাহ দ্বীন ও দুনিয়ায় তোমার যথেষ্ট মান সম্মান হইবে। এ সময় উক্ত ওস্তাদ ছাহেব তাঁহার দ্বারা ফত্‌ওয়া লিখাইতেন। ওস্তাদের প্রতি তাঁহার প্রগাঢ় ভক্তি ছিল। তিনি ওস্তাদের যথেষ্ট খেদমত করিতেন। ফলে তিনি ছাত্র জীবনে “আশরাফুত্তালাবা” েএবং কর্ম জীবনে “আশরাফুল ওলামা” নামে খ্যাতি লাখ করেন। যেমনি নাম তেমনি কাম।

দারুল উলূমের অধ্যয়ন শেষে কৃতী ছাত্রদের যথারীতি পাগড়ী পুরুষ্কার দেওয়া হয়। এব বৎসর কুত্‌বে আ’লম হযরত মাওলানা রশীদ আহ্‌মদ গঙ্গোহী ছাহেব (র:) স্বীয় পবিত্র হস্তে হযরত মাওলানা থানবীর মাথায় পাগড়ী বাধিয়া দিলেন।এ সময় মাদ্রাসার ওস্তাদদের নিকট তাঁহার প্রতিভার প্রশংসা শুনিয়া হযরত গঙ্গোহী ছাহেব তাঁহাকে কতিপয় কঠিন কঠিন প্রশ্ন করেন। হযরত মাওলানা ঐ সকল প্রশ্নের যথাযথ উত্তর প্রদান করিলেনয়। এই প্রকার দূর্বোধ্য প্রশ্নের সঠিক উত্তর শুনিয়া হযরত গঙ্গোহী ছাহেব মুগ্ধ হন এবং তাঁহার জন্য দো’আ করেন। ফলে তিনি শিক্ষা সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ যোগ্যতা সম্পন্ন জগৎ বরেণ্য আলেম হিসাবে প্রশিদ্ধ হইয়া পড়েন।

অধ্যাপনা :

পাঠ্য জীবন শেষে ১৩০১ হিজরীতে কানপুর ফয়েযে ‘আম মাদ্রাসায় মাসিক পঁচিশ টাকা বেতনে অধ্যাপনার কাজ আরম্ভ করেন। হাদীস, তফ্‌সীর ও উচ্চ স্তরের কিতাব সমূহ কৃতিত্বের সহিত পড়াইতে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে ওয়ায নছীহতের মাধ্যমেও জনগণকে মুগ্দ্ধ করিয়া ফেলেন।এদিকে মধুর কন্ঠস্বর গুরুগম্ভীর সম্বোধন, মার্জিত ভাষা ও অপূর্ব বণর্ণা ভঙ্গী, অপর দিকে কোরআন ও হাদীসের সরল ব্যাক্ষা, মা’রেফত ও তাছাউফের সূক্ষ্ম বিষয়ের সহজ সমাধান।

মোট কথা ওয়াজের মাহ্‌ফিলে অফুরন্ত ভান্ডার হইতে অভাবনীয় মুল্যবান তত্ত্ব ও তথ্য বিকশিত হইতে থাকিত। ফলে শ্রোতাবৃন্দের অন্তরে বিশেষ প্রতক্রিয়া সৃষ্টি হইত। তাঁহার ভাষণ সঙ্গে সঙ্গে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখা হইত। জনসমাজে হযরত মাওলানার জনপ্রিয়তা দেখিয়া মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের মধ্যে আর্থিক স্বার্থ লাভের বাসনা জাগরিত হয়। তাঁহারা তাঁহার ওয়ায মাহফিলে মাদ্রাসার জন্য চাঁদা আদায় করার কথা হযরত মাওলানার নিকট ব্যক্ত করিলেন। হযরত মাওলানা এই উপায়ে চাঁদা সংগ্রহ করা এলমী মর্যাদার খেলাফ ও না-যায়েজ মনে করিতেন। তাই তিনি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের আবেদন রক্ষায় অসম্মতি জ্ঞাপন করিলেন। ইহাতে কর্তৃপক্ষের মধ্যে পরস্পর নানা প্রকার কানা ঘুষা আরম্ভ হইল। এ কথা তাঁহার কর্ণগোচর হইলে তিনি মাদ্রাসার কার্যে ইস্তিফা দেন এবং সরাসরি বাড়ী চলিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত করেন। এল্‌মে দ্বীন ও দর্শন শাস্ত্রে এমন বিজ্ঞ ব্যক্তি দূর্লভ ভাবিয়া জনাব আবদুর রহমান খান ও জনাব কেফায়েত উল্যাহ সাহেব দ্বয় মাসিক ২৫ টাকা বেতনে টপকাপুরে অপর একটি মাদ্রাসায় অধ্যাপনার কাজের জন্য তাঁহাকে অনুরোধ করেন। এল্‌মে দ্বীনের খাতিরে হযরত মাওলানা তাঁহাদের অনুরোধ রক্ষায় সম্মত হন। টপকাপুর জামে মসজিদের নামে নামানুসারে মাদ্রাসার নাম রাখিলেন জামেউল উলূম। আজো কানপুরে এই মাদ্রাসা বিদ্যমান আছে এবং তাঁহার স্মৃতি ঘোষনা করিতেছে।

তিনি একাধারে চৌদ্দ বৎসর জামেউল উলূমে এল্‌মে দ্বীন শিক্ষাদানে মষগুল থাকেন। অতপর ১৩১৫ হিজরীর ছফর মাসে স্বীয় মুর্শিদ শায়লুল আরব ও আ’জম কুত্‌বে আ’লম হযরত হাজী এমদাদুল্যাহ মোহাজেরে মক্কী ছাহেবের অনুমতিক্রমে কানপুরের সংস্রব ত্যাগ করিয়া থানা ভবনে আসিয়া উম্মতে মুহাম্মদীয়ার সংস্কার সাধনে আত্ম নিয়োগ করেন।

বুযুর্গগনের খেদমতে মাওলানা থানভী :

আল্লাহর ওলীগণের প্রতি হযরত হাকীমুল উম্মতের ভক্তি ও মহব্বত ছিল অত্যন্ত গভীর।

তিনি বলিতেন, আল্লাহর ওলীদের নামের বরকতে রুহ সজীব এবং অন্তরে নূর পয়দা হয়। তিনি প্রায়ই বলিতেন, তরীকতের পথে আমি রিয়াযত ও মোজাহাদা করি নাই। আল্লাহ পাক যাহা কিছু দান করিয়াছেন সমস্তই শ্রদ্ধেয় ওস্তাদ ও বুযুর্গানে দ্বীনের আন্তরিক দো’আ ও তাওয়াজ্জুর বরকত পাইয়াছি।

যে মজযুব হাফেজ গোলাম মোরতাজার দো’আয় হযরত মাওলানার ইহজগতে আবির্ভাব হয়। এবং তাঁহার নাম করণ, “আশ্রাফ আলী” করেন। তিনি মাওলানাকে অত্যাধিক স্নেহ করিতেন। বালকাল হইতে তাঁহার অন্তরে খোদাপ্রেম বদ্ধমূল হওয়ার ইহাও অন্যতম কারণ বটে।

যখন দেওবন্দে হযরত মাওলানা রশীদ আহ্‌মদ গঙ্গোহী কুদ্দিসা সির্‌রুহু ছাহেবের সহিত সাক্ষাৎ হয়। তখন তাঁহার পবিত্র নূরানী চেহারা দর্ন মাত্র তাঁহার হাতে বায়’আত হওয়ার প্রবল আখাংকা হযরত মাওলানা থানভীর অন্তরে জাগরিত হয়। কিন্তু ছাত্র জীবনে মুরীদ হওয়া সমীচীন নহে বলিয়া তাঁহার বাসনা পূর্ণ হয় নাই। ১২৯৯ হিজরীতে হযরত মাওলানা গঙ্গোহী ছাহেব (র:) হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফ গমনকালে মাওলানা থানভী কুত্‌বুল আক্‌তাব হযরত হাজী ইমদাদুল্যাহ মোহাজেরে মক্কী ছাহেবের খেদমতে পত্রযোগে আবেদন করিলেন, তাঁহাকে বায়’আত করিবার জন্য যেন গঙ্গোহী ছাহেবকে বলিয়া দেন। যথা সময়ে পত্রের উত্তর আসিল। পত্রে লিখা ছিল- হযরত হাজী ছাহেব (র:) স্বয়ং তাঁহাকে মুরীদ করিয়াছেন। তখন তাঁহার বয়স মাত্র ১৯ বৎসর।

হযরত হাজী ছাহেব যখন মক্কায় হিযরত করেন, তখন হযরত থানভী (র:) ভূমিষ্টই হন নাই। অন্তশ্চক্ষু খুলিয়া গেলে স্থান কালের যাবতীয় পর্দা অপসারিত হইয় যায়। আ’রেফ বিল্লাহ হযরত হাজী ছাহেব পবিত্র মক্কায় থাকিয়াই থানা ভবনের এই মহামনিকে প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। তিনি হযরত মাওলানার পাঠ্যজীবনে তাঁহার পিতাকে লিখিয়াছিলেন। যখন তুমি হজ্জ করিতে আসিবে, তখন তোমার বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়া আসিও।

১৩০১ হিজরী শাওয়াল মাস। হাকীমুল উম্মত কানপুর জামেউল উলূম মাদ্রাসায় অধ্যাপনা করিতেছেন। তাঁহার পিতা পবিত্র হজ্জ ক্রিয়া পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফ গমনের জন্য প্রস্তুত হইলেন। স্নেহের পুত্র হাকীমুল উম্মতও তাঁহার সঙ্গী হইলেন। যথা সময়ে পিতা-পুত্র পবিত্র মক্কা ভূমিতে হযরত হাজী ছাহেবের খেদমতে উপনীত হইলেন। ইহাই হইল তাঁহার সহিত হযরত মাওলানার প্রথম সাক্ষাৎকার। হাজী ছাহেব হযরত মাওলানার দর্শন লাভ করিয়া পরম পরিতুষ্ট হইলেন এভং হাতে হাতে তাঁহার বায়’আত করিলেন। তখন তাঁহার পিতাকেও বায়’আত করিলেন। পিতা-পুত্র উভয়ে এক মুর্শিদের হাতে বায়’আত হইলেন। হজ্জের পর হযরত হাজী ছাহেব, হাকীমুল উম্মতকে ছয়মাস তাঁহার খেদমতে অবস্থান করিতে বলিলেন, কিন্তু পিতার মন স্নেহের পুত্রকে একা দূরদেশে রাখিয়া যাইতে চাহিল না। অগত্যা হযরত ছাহেব বলিলেন, পিতার তাকেদারী অগ্রগণ্য, এখন যাও, আগামীতে দেখা যাইবে।

হজ্জ হইতে প্রত্যাগম করিয়া অধ্যাপনা, গ্রন্থ রচনা, তাবলীগ, ফতওয়া প্রদান ইত্যাদি কার্যে পূণরায় আত্ননিয়োগ করেন। এদিকে মুর্শিদের সহিত পত্র বিনিময় হইতে লাগিল। তিনি প্রায় সহস্রাধিক গ্রন্থ রচনা করেন।

১৩০৭ হিজরী হইতে হযরত মাওলানার নূতন জীবন আরম্ভ হইল। পার্থিব সহস্রব অপেক্ষা আধ্যাত্নিক উন্নতির দিকে তাঁহার মন ধাবিত হইল। হযরত ছাহেবের খেদমতে মাদ্রাসার সম্পর্ক ছিন্ন করার অনুমতি প্রার্থনা করিয়অ পত্র লিখিলেন। উত্তর আসিল, আল্লাহ্‌র বন্দাদেরকে দ্বীনের ফয়েজ পৌঁছান আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের উপায়। শ্রদ্ধেয় মুর্শিদের পরামর্শ শিরোধার্য। তাই এলমে দ্বীন শিক্ষা প্রদানের কাজ চালু রাখিলেন। এই ভাবে তিন বৎসর অতীত হওয়ার পর হিজরী ১৩১০ সালে হযরত মাওলানার ধৈর্যের বাধ ভাঙ্গিয়া গেল। অনেক চেষ্টা করিয়াও মনকে। আর প্রবোধ দিতে পারিলেন না। আর মুরশিদ বলিয়াছিলেন, “মিয়া আশরাফ আলী, ছয় মাস আমার নিকট থাক”। মুর্শিদের সেই আহ্বান তৎক্ষনাৎ হযরত মাওলানার অন্তরে দাগ কাটিয়া গিয়াছিল। ঐ একই কথা বার বার তাঁহার অন্তরে তোলপাড় করিলে লাগিল। কি অদৈম্য আকর্ষন! অবশেষে দীর্ঘকাল প্রতীক্ষার পর মক্কা শরীফে গমনের অনুমতিপত্র আসিল। স্নেহের মুরীদ প্রাণপ্রিয় মুর্শিদের খেদমতে পৌঁছিয়া স্বস্থির নিশ্বাস ফেলিলেন। এবং মুর্শিদের পদতলে নিজের সত্ত্বা বিলীন করিয়া দিলেন। মুর্শিদও আকাশের চাঁদ হাতে পাইলেন। অতি অল্প দিনের মধ্যেই পীর ও মুরীদ একই রং ধারণ করিলেন। হযরত হাজী ছাহেব নিঃ সংকোচে ফরমাইলেতন। মিয়া আশরাফ! তুমি তো সম্পূর্ণ আমার তরীকার উপর। হযরত মাওলানার কোন লিখা তাঁহার দৃষ্টি গোচর হইলে বলিতেন, আরে তুমি তো আমারই মনের কথা ব্যক্ত করিয়াছ।

হযরত হাজী ছাহেবের খেদমতে মা’রেফত সম্বন্ধে কেহ কোন কথা জানিতে চাহিলে তিনি হযরত মাওলানার দিকে ইঙ্গিত করিয়া বলিতেন, একে জিঞ্জাসা কর, সে ইহা ভাল রুপে বুঝিয়াছে। ইহার কারণ, মুর্শিদ বুঝিতে পাইয়াছিলেন, মুরীদের আধ্যাত্নিক উন্নতি পূর্ণতার স্তরে পৌছিয়াছে। ছয় মাসের মাত্র এক সপ্তাহ বাকী থাকিতে হযরত মাওলানা সাহেবের খেদমত হইতে বিদায়ের অনুমতি চাইলেন তখন হযরত হাজী ছাহেব তাহাকে খাছ করিয়া দুইটি অছিয়ত করিলেন। ১. মিয়া আশ্‌রাফ আলী! হিন্দুস্তানে গিয়া তুমি একটি বিশেষ অবস্থার সম্মুখীন হইবে, তখন ত্বরা করিও না। ২. কানপুর হইতে মন উঠিয়া গেলে অন্য কোথাও সম্পর্ক স্থাপণ করিও না। আল্লাহর উপর ভরসা করিয়া থানা ভবনেই অবস্থান করিও। হিজরী ১৩১১ সনে প্রিয় জন্ম ভূমি থানা ভবনের আহ্বান হযরত মাওলানাকে বিচলিত করিয়া তুলিল। অবশেষে শ্রদ্ধেয় মুর্শিদের ওছিয়ত ও আধ্যাত্নিক সম্পদ সহ থানা ভবনে আসিয়া হাজির হইলেন।

হযরত হাজী ছাগেব কেব্‌লা হযরত মাওলানাকে এক অধিক স্নেহ করিতেন যে, কেহ মাওলানার পরিচয় জিঞ্জাসা করিলে তিনি তাঁহাকে নাতি বলিয়া পরিচয় দিতেন। অত্যধিকস্নেহ বশতঃ তিনি তাঁহাকে মিয়া আশ্‌রাফ বলিয়া সম্বোধন করিতেন। একবার মুর্শিদে আ‘লা প্রিয়তম শিষ্যকে স্বীয় খাছ কুতুবখানা দিতে চাহিয়াছিলেন। হযরত মাওলানা আরয করিলেন, এই সব কিতাব তো আধ্যাত্নিকতার খোলস মাত্র, অনুগ্রহ করে উহার পরিবর্তে আমার ছিনায় কিছু দান করুন। প্রিয়তম শিষ্যের এমন গভীর তত্ত্বপূর্ণ আব্‌দার শুনিয়া মুর্শিদ বলিলেন, হ্যাঁ, সত্য বটে, কিতাবে আর কি আছে? সবই তো সিনায় রহিয়াছে। মুর্শিদের আন্তরিক দোয়ায় মাওলানা অন্তকরণ এল্‌মে মা’রেফতে ভরপুর হইয়া গেল। বিদায় গ্রহণকালে হযরত হাজী ছাহেব মুরাক্বাবা করিয়া বলিলে, আশ্চর্য! ইহার সম্মান কাশেম ও রশীদকে অতিক্রম করিয়া গেল।

বস্তুতঃ এই ভবিষ্যদ্বানী অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হইয়াছিল।

মুর্শিদের খেদমত হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়া হযরত মাওলানা দেশে ফিরিয়া আসিলেন। অতপর চিঠি পত্রের আদান প্রদান চলিতে লাগিল। হযরত হাজী সাহেব হাজীদের মারফৎ বলিতেন, “আমার মিহিন মৌলভীকে সালাম বলিও।” এই মিহিন শব্দে হযরত মাওলানার চিক্ষণতা ও দূরদর্শিতা রুপ গুণাবলীর প্রতি ইঙ্গিত করিয়াছেন। পীর ও মুরিদের কী অপূর্ব সর্ম্পক, কী মায়া, কি ভক্তি!

হযরত মাওলানা দেশে ফিরিবার সময় কানপুরে বখ্‌শী নযীর হাসান ছাহেব স্বপ্নে দেখিলেন, হযরত মাওলানা জাহাজ হইতে অতরণ করিতেছেন।আর সারা হিন্দস্তান তাঁহার দেহের নূরে নূরানী হইয়া উঠিয়াছে। কালে এই স্বপ্ন বাস্তব রুপয়িত হইয়াছিল।

দেশে ফিরিয়া পুনরায় তিনি জামেউল উলুমে অধ্যাপনার কাজে আত্বনিয়োগ করেন। শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে মা’রেফতের আলো বিচ্ছুরিত হইল। এক কথায় মাদ্রাসা যিক্‌র আয্‌কারের খানক্বায় পরিণত হইল। বহু অমুসলিমও ইসলাম ধর্ম্ গ্রহণ করিয়া ধন্য হইল। চৌদ্দ বৎসর অধ্যাপনার পর হিজরী ১৩১৫ সালে কানপুর হইতে থানা ভবনে আসিয়া খানক্বায়ে এমদাদিয়ার আবাদে মশ্‌গূল হইলেন। হযরত মাওলানার থানা ভবনে আগমনের সংবাদে হযরত হাজী ছাহেব নেহায়েত খুশী হইয়া লিখিলেনঃ ‘আপনার থানা ভবন যাওয়া অতি উত্তম হইয়াছে। আশা করি, আপনার দ্বারা বহু লোকের যাহেরী-বাতেনী উপকার হইবে এবং আপনি আমাদের মাদ্রাসা ও মসজিদ পুণঃ আবাদ করিবেন। আপনার জন্য দোয়া করিতেছি।’ - মকতুবাত তিনি পার্থিব ধন-সম্পদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করিয়া আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় থানা ভবনে আসিলেন। আল্লাহ পাক তাঁহার দ্বারা উম্মতে মোহাম্মদীয়ার বিরাট কর্ম সম্পাদন করাইলেন। পাক-ভারতের বিভিন্ন আঞ্চল হইতে দলে দলে বহু আলেম ওলামা, অর্ধ শিক্ষিত, সকল শ্রেনির লোকই তাঁহার দরবার হইতে ফয়েয হাসেল করিবার জন্য সমবেত হইত এবং প্রত্যেক নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী তাহা লাভ করিত। হাকীমুল উম্মত মোজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা আশ্‌রাফ আলী থানভীর ফয়েয ও বরকত ছিল বিভিন্ন মূখী ও সূদূরপ্রসারী। সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় তাহা প্রকাশ করা সুদুরপরাহত। তাঁহার মধ্যে যে সব গুণাবলী বিদ্যমান ছিল, তাহা কয়েকজনে মিলিত ভাবে অর্জন করা সম্ভব নহে। তিনি একাধারে ছিলেন কোরআন পাকের অনুবাদক ও কোরআনের ব্যাখ্যাকার, মুহাদ্দিস, ফকীহ, এবং একজন লেখক। তিনি প্রায় এক সহস্র কিতাব রচনা করিয়াছেন। তন্মধ্যে অনেক কিতাব বহু ভলিউম বিশিষ্ট তাঁহার রটচত প্রায় কিতাবই তাছাওউফে ভরপুর। তফসীরকার হিসাবে তিনি জগত বিক্ষাৎ। তাঁহার কৃত তফসীর “তফসীরে বয়ানুল কোরআন” অদ্বিতীয়। ওয়ায়েজ হিসাবে ছিলেন অতুলনীয়। তাঁহার তথ্যপূর্ণ বিভিন্ন মূখী ওয়ায সমূহ ওয়াযের সময় সঙ্গে সঙ্গে লিপিবদ্ধ করা হইত এবং পত্র-পত্রিকায়ও মুদ্রিত হইত। পরে এই গুলি পুস্তকাকারে মুদ্রিত হয়। তাঁহার রচিত পুস্তকাবলী ও ওয়ায সমূহ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদিত হইয়াছে।তাঁহার রচিত কোন কিতাবের স্বত্ত্ব সংরক্ষিত নহে। যে কেহ ছাপিতে পারে। কি অপূর্ব স্বার্থ ত্যাগ! বাংলা ভাষায়ও তাঁহার রচিত অসংখ্য কিতাব মুদ্রিত হইয়াছে ও হইতেছে। এল্‌মে দ্বীনের উত্তাদ হিসাবে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। অসংখ্য আলেমে হক্কানী তাঁহার হাতে গড়া। এতদ্ভিন্ন তিনি ছিলেন পীর ও মুর্শিদে কামেল।

তাছাওউফের দিক দিয়া তিনি ছিলেন মুজাদ্দিদে মিল্লাত বা যুগপ্রবর্তক। এক কথায় তিনি ছিলেন মুজতাহিদ যুগসংস্কারক। অনেক ছুফী, পীর এল্‌মে তাছাওউফকে বিকৃত করিয়া তুলিয়াছিল। তিনি এই বিকৃত তাছাওউফকে ত্রুটি যুক্ত বশতঃ জগৎ বাসীর সামনে তুলিয়া ধরিয়াছিলেন। তাঁহারই সূক্ষ্ম ব্যবস্থা ও চিকিৎসা দ্বারা তাছাওউফের ভ্রান্ত পদ্দতির সংস্কার সাধিত হইয়াছে। বহু যোগ্য মুরীদকে খেরক্বায়ে খেলাফত দান করিয়াছেন। তাঁহার খলিফাগণের লক্ষ লক্ষ মুরীদ শুধু পাক-ভারতেই নহে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়াইয়া রহিয়াছে। (হায়াতে আশ্‌রাফ, সীরাতে আশ্‌রাফ দ্রঃ)

চির বিদায়ঃ

১৯ শে জুলাই ১৯৪৩ ইং সোমবার দিবাগত রাত্রে এশার নামাজের পর তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁহার বয়স হয়েছিল বিরাশী বছর তিন মাস এগার দিন। ইন্তেকালের দুইদিন পূর্বে পাঞ্জাবের এক মসজিদের ইমাম (সৈয়দ আনোয়ার শাহ্‌ কাশমীরীর শাগরিদ) স্বপ্নে দেখেন, আকাশ প্রান্তে ধীরে ধীরে লিখা হইতেছে ..............................(ইসলামের বাহু ভাঙ্গিয়া গিয়াছে)

কারামতঃ

১. এক ব্যক্তি হাকীমুল উম্মতের জন্য আখের গুড় হাদিয়া সরুপ আনিল, কিন্তু তিনি উহা গ্রহণ করিলেন না। পরে জানা গেল যে, ঐ গুড় ছিল জাকাতের।

৫. একবার তিনি লায়লপুর ষ্টেশনে গাড়ীর অপেক্ষায় ছিলেন। ষ্টেশন মাষ্টার চাকরকে ষ্টেশনের বাতি জ্বালাইয়া হযরতের হযরতের কামরায় দিতে আদেশ করিলেন। হযরত আল্লাহ পাকের দরবারে পরের হক নষ্ট করা হইতে বাঁচিবার দো‘আ করিলেন। মাষ্টারের মন মুহুর্তে পরিবর্তিত হইয়া গেল। তিনি চাকরকে তাহার নিজস্ব বাতি জ্বালাইতে দিতে আদেশ করিলেন।

৬. কানপুরে কলিমুল্লাহ নামে এক ব্যক্তির হামেশা অসুখ লাগিয়া থাকিত। আরবী ‘কিল্ম’ (অর্থ জখম) হইতে এই কলিমুল্লাহ নামের উৎপত্তি বলিয়া তাঁহার নাম রাখিয়া দিলেন ছলিমুল্যাহ। অতপর ঐ ব্যক্তির কোন অসুখ হইত না।

৭. একবার হযরত থানভী (র:) কানপুরে বাশমন্ডীতে ওয়াজ করিতে ছিলেন। হঠাৎ ঝড় আসিল। হযরত তাঁহার শাহাদাৎ আঙ্গুলীতে ফুক দিয়া ঘুরাইলেন। তৎক্ষনাৎ ঝড়ের মোড় ঘুরিয়া অন্য দিকে চলিয়া গেল। ওয়াজের কাজ নির্বিগ্নে সম্পন্ন হইল।

৮, মাওলানা হাকীম আবদুল হক বলেন, যে ব্যক্তি হযরতের দরবারে খাঁটি নিয়তে বসিত তাহার আপনা হইতে পরিষ্কার হইয়া যাইত এবং দ্রুত আখিরাতের দিকে মন আকৃষ্ট হইয়া পড়িত।

একটি স্বপ্নঃ

৯. একবার হযরত মাওলানা যাফর আহামদ ওসমানী সাহেব স্বপ্নে দেখিলেন, মদীনা শরীফের এক বুযুর্গ তফ্‌সীরে বয়ানুল কোরআনের তা‘রীফ করিতে করিতে বলিলেন, নবী করিম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বার বার বলিতেছেন, অমুক আয়াতের তফসীর বয়ানুল কোরআনে এই ভাবে লিখা আছে। হযরত ওসমানী বলেন, আমার ষ্পষ্ট মনে পড়ে আমি হযরত (দঃ) এর এই উক্তি নিজ কানে শুনিয়াছি। স্বপ্নে আমার ইহাও অনূভূত হইল যে, নবী করীমের দারবারে “বয়ানুল কোরআন” এরুপ মকবুল হওয়ার কারণ, হযরত মাওলানার পরিপূর্ণ এখলাছ।

২. হে হযরত হাকীমুল উম্মতের খেদমতে এসলাহের জন্য আসিলে তিনি তাহার গোপনরোগ ধরিতে পারিতেন এবং ঐ হিসাবে তাহার এসলাহ করিতেন। তাঁহার নিকট কোন রোগ গোপন রাখার উপায় ছিলনা।

৩. তাঁহার কোন ভক্ত রোগারোগ্যের জন্য দো‘আ চাহিয়া পত্র লিখিলে লেখার সঙ্গে সঙ্গে নিরাময় হইয়া যাইত।

৪. তাঁহার জনৈক খলিফা বলেন, একদা আলীগড়ের শিল্প-প্রদর্শনীতে দোকান খুলিয়াছিলাম। মাগরি্বের পর প্রদর্শনীর কোন এক ষ্টলে আগুন লাগে। আমি একাকী আমার মালপত্র সরাইতে সক্ষম হইতে ছিলাম না। আকস্মাৎ দেখিলাম, হযরত হাকীমুল উম্মত আমার কাজে সাহায্য করিতেছেন। তাই আমার বিশেষ কোন ক্ষতি হয় নাই। পরে জানিলাম, হযরত তখন থানা ভবনেই অবস্থান করিতে ছিলেন।