Showing posts with label সফলতা. Show all posts
Showing posts with label সফলতা. Show all posts

হযরত ইসমাঈল (আ:) | Hazrat ismail | Nhrepon.com

হযরত ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)



আল্লাহ বলেন,


وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولاً نَّبِياًّ- وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَهُ بِالصَّلاَةِ وَالزَّكَاةِ وَكَانَ عِندَ رَبِّهِ مَرْضِيًّا-


‘এই কিতাবে আপনি ইসমাঈলের কথা বর্ণনা করুন। তিনি ছিলেন ওয়াদা রক্ষায় সত্যাশ্রয়ী এবং তিনি ছিলেন রাসূল ও নবী’। ‘তিনি তাঁর পরিবারবর্গকে ছালাত ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিতেন এবং তিনি স্বীয় পালনকর্তার নিকট পসন্দনীয় ছিলেন’ (মারিয়াম ১৯/৫৪-৫৫)।


হযরত ইসমাঈল (আঃ) ছিলেন পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং মা হাজেরার গর্ভজাত একমাত্র সন্তান। ঐ সময়ে ইবরাহীমের বয়স ছিল ৮৬ বছর।

শিশু বয়সে তাঁকে ও তাঁর মাকে পিতা ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে মক্কার বিজন ভূমিতে রেখে আসেন। সেখানে ইবরাহীমের দো‘আর বরকতে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে যমযম কূপের সৃষ্টি হয়। 

অতঃপর ইয়ামনের ব্যবসায়ী কাফেলা বনু জুরহুম গোত্র কর্তৃক মা হাজেরার আবেদনক্রমে সেখানে আবাদী শুরু হয়। ১৪ বছর বয়সে আল্লাহর হুকুমে মক্কার অনতিদূরে মিনা প্রান্তরে সংঘটিত হয় বিশ্ব ইতিহাসের বিস্ময়কর ত্যাগ ও কুরবানীর ঘটনা।

 পিতা ইবরাহীম কর্তৃক পুত্র ইসমাঈলকে স্বহস্তে কুরবানীর উক্ত ঘটনায় শতবর্ষীয় পিতা ইবরাহীমের ভূমিকা যাই-ই থাকুক না কেন চৌদ্দ বছরের তরুণ ইসমাঈলের ঈমান ও আত্মত্যাগের একমাত্র নমুনা ছিলেন তিনি নিজেই।

তিনি স্বেচ্ছায় নিজেকে সমর্পণ না করলে পিতার পক্ষে পুত্র কুরবানীর ঘটনা সম্ভব হ’ত কি-না সন্দেহ। তাই ঐ সময় নবী না হ’লেও নবীপুত্র ইসমাঈলের আল্লাহভক্তি ও দৃঢ় ঈমানের পরিচয় ফুটে উঠেছিল তাঁর কথায় ও কর্মে।

এরপর পিতার সহযোগী হিসাবে তিনি কা‘বা গৃহ নির্মাণে শরীক হন এবং কা‘বা নির্মাণ শেষে পিতা-পুত্র মিলে যে প্রার্থনা করেন, আল্লাহ পাক তা নিজ যবানীতে পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছেন (বাক্বারাহ ২/১২৭-১২৯)।


এভাবে ইসমাঈল স্বীয় পিতার ন্যায় বিশ্বের তাবৎ মুমিন হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন। আল্লাহ তাঁর প্রশংসায় সূরা মারিয়াম ৫৪ আয়াতে বলেন, তিনি ছিলেন ওয়াদা রক্ষায় সত্যাশ্রয়ী’ যা তিনি যবহের পূর্বে পিতাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন,


يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَآء اللهُ مِنَ الصَّابِرِينَ، ‘হে পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা কার্যকর করুন। আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ছবরকারীদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন’ (ছাফফাত ৩৭/১০২)।



অতঃপর কা‘বা নির্মাণকালে পিতা-পুত্রের দো‘আর (বাক্বারাহ ১২৭-২৯) বরকতে প্রথমতঃ কা‘বা গৃহে যেমন হাযার হাযার বছর ধরে চলছে তাওয়াফ ও ছালাত এবং হজ্জ ও ওমরাহর ইবাদত, তেমনি চলছে ঈমানদার মানুষের ঢল।

দ্বিতীয়তঃ সেখানে সারা পৃথিবী থেকে সর্বদা আমদানী হচ্ছে ফল-ফলাদীর বিপুল সম্ভার। তাঁদের দো‘আর তৃতীয় অংশ মক্কার জনপদে নবী প্রেরণের বিষয়টি বাস্তবায়িত হয় তাঁদের মৃত্যুর প্রায় আড়াই হাযার বছর পরে ইসমাঈলের বংশে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আবির্ভাবের মাধ্যমে।

ইসমাঈল (আঃ) মক্কায় আবাদকারী ইয়ামনের বনু জুরহুম গোত্রে বিবাহ করেন। তাদেরই একটি শাখা গোত্র কুরায়েশ বংশ কা‘বা গৃহ তত্ত্বাবধানের মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত হয়। এই মহান বংশেই শেষনবীর আগমন ঘটে।


উল্লেখ্য যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ৯টি সূরায় ২৫টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।


পিতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের দৃষ্টান্ত :


তিনি পিতার প্রতি কেমন শ্রদ্ধাশীল ও অনুগত ছিলেন, তা নিম্নোক্ত ঘটনা দ্বারা বুঝা যায়। হাজেরার মৃত্যুর পর ইবরাহীম (আঃ) যখন ইসমাঈলকে দেখতে যান, তখন তার স্ত্রীকে কুশলাদি জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমরা খুব অভাবে ও কষ্টের মধ্যে আছি’।

জবাবে তিনি বলেন, তোমার স্বামী এলে তাকে আমার সালাম দিয়ে বলো যে, তিনি যেন দরজার চৌকাঠ পাল্টে ফেলেন’। পরে ইসমাঈল বাড়ী ফিরলে ঘটনা শুনে বলেন, উনি আমার আববা এবং তিনি তোমাকে তালাক দিতে বলেছেন।

ফলে ইসমাঈল স্ত্রীকে তালাক দেন ও অন্য স্ত্রী গ্রহণ করেন। পরে একদিন পিতা এসে একই প্রশ্ন করলে স্ত্রী বলেন, আমরা ভাল ও সচ্ছলতার মধ্যে আছি এবং তিনি আল্লাহর প্রশংসা করেন। ইবরাহীম তাদের সংসারে বরকতের জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেন।

অতঃপর তাকে বলেন, তোমার স্বামী ফিরলে তাকে বলো যেন দরজার চৌকাঠ ঠিক রাখেন ও মযবূত করেন’। ইসমাঈল ফিরে এলে ঘটনা শুনে তার ব্যাখ্যা দেন ও বলেন, উনি আমার পিতা।

তোমাকে স্ত্রীত্বে বহাল রাখার নির্দেশ দিয়ে গেছেন। এই ঘটনার কিছু দিন পর ইবরাহীম পুনরায় আসেন। অতঃপর পিতা-পুত্র মিলে কা‘বা গৃহ নির্মাণ করেন।


প্রথম বিশুদ্ধ আরবী ভাষী :


ইসমাঈল সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, 


أَوَّلُ مَنْ فَتَقَ لِسَانَهُ بِاْلعَرَبِيَّةِ الْبَيِّنَةِ إِسْمَاعِيْلُ وَهُوَ ابْنُ اَرْبَعَ عَشَرَةَ سَنَةٍ- 


‘সর্বপ্রথম ‘স্পষ্ট আরবী’ ভাষা ব্যক্ত করেন ইসমাঈল। যখন তিনি ছিলেন মাত্র ১৪ বছর বয়সের তরুণ’।

এখানে ‘স্পষ্ট আরবী’ অর্থ ‘বিশুদ্ধ আরবী ভাষা’ (العربية الفصيحة البليغة) এটাই ছিল কুরায়শী ভাষা (لغة قريش ), যে ভাষায় পরে কুরআন নাযিল হয়।

এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সকল ভাষাই আল্লাহ কর্তৃক ইলহামের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। ইসমাঈল ছিলেন বিশুদ্ধ কুরায়শী আরবী ভাষার প্রথম ইলহাম প্রাপ্ত মনীষী।

এটি ইসমাঈলের জন্য একটি গৌরবময় বৈশিষ্ট্য। এজন্য তিনি ছিলেন ‘আবুল আরব’ (أبوالعرب) বা আরবদের পিতা। 


অন্যান্য নবীগণের ন্যায় যদি ইসমাঈল ৪০ বছর বয়সে নবুঅত পেয়ে থাকেন, তাহ’লে বলা চলে যে, ইসমাঈলের নবুঅতী মিশন আমৃত্যু মক্কা কেন্দ্রিক ছিল।

তিনি বনু জুরহুম গোত্রে তাওহীদের দাওয়াত দেন। ইস্রাঈলী বর্ণনানুসারে তিনি ১৩৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ও মা হাজেরার পাশে কবরস্থ হন’।

কা‘বা চত্বরে রুকনে ইয়ামানীর মধ্যে তাঁর কবর হয়েছিল বলে জনশ্রুতি আছে। তবে মক্কাতেই যে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল, এটা নিশ্চিতভাবে ধারণা করা যায়। 


ইসমাঈলের বড় মহত্ত্ব এই যে, তিনি ছিলেন ‘যবীহুল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহর রাহে স্বেচ্ছায় জীবন উৎসর্গকারী এবং তিনি হ’লেন শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর মহান পূর্বপুরুষ। আল্লাহ তাঁর উপরে শান্তি বর্ষণ করুন। তাঁর সম্পর্কে ইবরাহীমের জীবনীতে আলোচিত হয়েছে। 

যবীহুল্লাহ কে?

উক্ত বিষয়ে মূলত: কোন মতভেদ নেই। কেননা মুসলিম ও আহলে কিতাব প্রায় সকল বিদ্বান এ বিষয়ে একমত যে, তিনি ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)। কেননা তিনিই ইবরাহীমের প্রথম পুত্র এবং হাজেরার গর্ভে জন্ম। তিনি মক্কাতেই বড় হন।
সেখানেই বসবাস করেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। কুরবানীর মহান ঘটনা মক্কাতেই ঘটে। তিনি কখনোই কেন‘আনে আসেননি। পিতা ইবরাহীম তাকে নিয়ে মক্কায় কা‘বা গৃহ নির্মাণ করেন। 



পক্ষান্তরে ইসহাকের জন্ম হয় কেন‘আনে বিবি সারাহর গর্ভে ইসমাঈলের প্রায় চৌদ্দ বছর পরে। শৈশবে তিনি মক্কায় এসেছেন বলে জানা যায় না। পবিত্র কুরআনের সূরা বাক্বারায় ১৩৩,৩৬, ৪০; সূরা আলে ইমরান ৮৪, নিসা ১৬৩, ইবরাহীম ৩৯, ছাফফাত ১০০-১১৩ আয়াতগুলিতে সর্বত্র ইসমাঈলের পরেই ইসহাক ও ইয়াকূবের আলোচনা এসেছে।

এব্যাপারে সকল ইস্রাঈলী বর্ণনা একমত যে, ইসমাঈলের জন্মের সময় ইবরাহীমের বয়স ছিল ৮৬ বছর। পক্ষান্তরে ইসহাক জন্মের সময় ইবরাহীমের বয়স ছিল অন্যূন ১০০ বছর এবং সারাহর বয়স ছিল অন্যূন ৯০ বছর। 



নিঃসন্তান ইবরাহীম বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহর নিকট একটি ‘নেককার সন্তান’ প্রার্থনা করেছিলেন। যেমন رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ، فَبَشَّرْنَاهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি সৎকর্মশীল সন্তান দান কর।’ ‘অতঃপর আমরা তাকে একটি ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।’ (ছাফফাত ৩৭/১০০-০১)। আর তিনিই ছিলেন প্রথম সন্তান ইসমাঈল। অতঃপর ইসমাঈলের কুরবানীর ঘটনা শেষে যখন ইবরাহীম কেন‘আনে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন সেখানে ফেরেশতাদের আগমন ঘটে।
যারা লূত-এর কওমকে ধ্বংস করতে যাওয়ার পথে তাঁর বাড়ীতে যাত্রা বিরতি করেন এবং সারাহর গর্ভে ইসহাক জন্মের ও তার ঔরসে পরবর্তীতে ইয়াকূব জন্মের সুসংবাদ প্রদান করেন (হূদ ১১/৭১)। সূরা ছাফফাত ১০১ আয়াতে ইবরাহীমকে একটি ধৈর্য্যশীল সন্তানের সুসংবাদ শুনানোর পরে কুরবানীর ঘটনা বর্ণনা শেষে ১১২ আয়াতে বলা হয়েছে وَبَشَّرْنَاهُ بِإِسْحَاقَ نَبِيّاً مِّنَ الصَّالِحِينَ ‘অতঃপর আমরা তাকে ইসহাক জন্মের সুসংবাদ দিলাম যিনি নবী হবেন ও সৎকর্মশীলগণের অন্তর্ভুক্ত হবেন’ (ছাফফাত ৩৭/১১২)।
উক্ত আয়াতগুলির বর্ণনা পরম্পরায় স্পষ্ট বুঝা যায় যে, প্রথম সুসংবাদ প্রাপ্ত সন্তানটি ছিলেন ইসমাঈল, যাকে কুরবানী করা হয়। অতঃপর সুসংবাদ প্রাপ্ত সন্তান ছিলেন ইসহাক। যেমন ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে দো‘আ করেন الْحَمْدُ لِلّهِ الَّذِيْ وَهَبَ لِيْ عَلَى الْكِبَرِ إِسْمَاعِيْلَ وَإِسْحَاقَ إِنَّ رَبِّيْ لَسَمِيْعُ الدُّعَاء- ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমাকে বৃদ্ধ বয়সে দান করেছেন ইসমাঈল ও ইসহাককে।
নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক অবশ্যই দো‘আ কবুলকারী’ (ইবরাহীম ১৪/৩৯)। এখানে তিনি ইসমাঈলের পরে ইসহাকের নাম উল্লেখ করেছেন। উপরোক্ত আলোচনায় একথা স্পষ্ট হয় যে, যবীহুল্লাহ ছিলেন ইবরাহীমের প্রথম সন্তান ইসমাঈল। 


এক্ষণে পূর্বের ও পরের যে সকল বিদ্বান ইসহাককে যবীহুল্লাহ বলেছেন, তারা মূলতঃ ইসরাঈলী বর্ণনাসমূহের উপর নির্ভর করেছেন। যার প্রায় সবগুলিই কা‘ব আল-আহবারের বর্ণনা থেকে নেওয়া হয়েছে।
এই ইহুদী পন্ডিত হযরত ওমর (রাঃ)-এর খেলাফতকালে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাওরাত বিশেষজ্ঞ হিসাবে খ্যাত এই ব্যক্তি নানা বিকৃত বর্ণনা পরিবেশন করেন।

এটা ছিল আরবদের প্রতি ইহুদীদের চিরন্তন বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। কেননা ইসমাঈল ছিলেন আরব জাতির পিতা। যিনি হেজাযে বসবাস করতেন।
আর তার বংশেই এসেছিলেন শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)। পক্ষান্তরে ইসহাক ছিলেন ইয়াকূবের পিতা। যিনি কেন‘আনে বসাবস করতেন।

আর ইয়াকূবের অপর নাম ছিল ইস্রাঈল। যার দিকেই বনু ইস্রাঈলকে সম্বন্ধ করা হয়। ফলে হিংসুক ইস্রাঈলীরা আরবদের সম্মান ছিনিয়ে নেয়ার জন্য আল্লাহর বাণীকে পরিবর্তন করতে চেয়েছে এবং ইসমাঈলের বদলে ইসহাকের নাম যবীহুল্লাহ বলে প্রচার করেছে। যা স্রেফ মিথ্যা ও অপবাদ মাত্র।


হযরত ইসহাক (আ:) | Hazrat ishap | নবীদের জীবনী | Nhrepon.com

হযরত ইসহাক (আলাইহিস সালাম)



হযরত ইসহাক ছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রথমা স্ত্রী সারাহ-এর গর্ভজাত একমাত্র পুত্র। তিনি ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর চৌদ্দ বছরের ছোট।

এই সময় সারাহর বয়স ছিল ৯০ এবং ইবরাহীমের বয়স ছিল ১০০। অতি বার্ধ্যক্যের হতাশ বয়সে বন্ধ্যা নারী সারাহ্-কে ইসহাক জন্মের সুসংবাদ নিয়ে ফেরেশতা আগমনের ঘটনা আমরা ইতিপূর্বে বিবৃত করেছি।

পবিত্র কুরআনে আকর্ষণীয় ভঙ্গীতে এ বিষয়ে আলোচিত হয়েছে সূরা হূদ ৭১-৭৩ আয়াতে, হিজর ৫১-৫৬ আয়াতে এবং যারিয়াত ২৪-৩০ আয়াতে- যা আমরা ইবরাহীমের জীবনীতে বর্ণনা করেছি।

 আল্লাহ ইসমাঈলকে দিয়ে যেমন মক্কার জনপদকে তাওহীদের আলোকে উদ্ভাসিত করেছিলেন, তেমনি ইসহাক্বকে নবুঅত দান করে তার মাধ্যমে শাম-এর বিস্তীর্ণ এলাকা আবাদ করেছিলেন।



হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় জীবদ্দশায় পুত্র ইসহাক্বকে বিয়ে দিয়েছিলেন রাফক্বা বিনতে বাতওয়াঈল (رفقا بنت بتوائيل )-এর সাথে। কিন্তু তিনিও বন্ধ্যা ছিলেন। পরে ইবরাহীমের খাছ দো‘আর বরকতে তিনি সন্তান লাভ করেন এবং তাঁর গর্ভে ঈছ ও ইয়াকূব নামে পরপর দু’টি পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করে। 

তার মধ্যে ইয়াকূব নবী হন। পরে ইয়াকূবের বংশধর হিসাবে বনু ইস্রাঈলের হাযার হাযার নবী পৃথিবীকে তাওহীদের আলোকে আলোকিত করেন। কিন্তু ইহুদী নেতাদের হঠকারিতার কারণে তারা আল্লাহর গযবে পতিত হয় এবং অভিশপ্ত জাতি হিসাবে নিন্দিত হয়। যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

ইসহাক্ব (আঃ) ১৮০ বছর বয়স পান। তিনি কেন‘আনে মৃত্যুবরণ করেন এবং পুত্র ঈছ ও ইয়াকূবের মাধ্যমে হেবরনে পিতা ইবরাহীমের কবরের পাশে সমাহিত হন। স্থানটি এখন ‘আল-খালীল’ নামে পরিচিত’।

উল্লেখ্য যে, হযরত ইসহাক্ব (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ১৪টি সূরায় ৩৪টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।


যথাক্রমে সূরা বাক্বারাহ ২/১৩২, ১৩৩, ১৩৬, ১৪০; আলে ইমরান ৩/৮৪; নিসা ৪/১৬৩; আন‘আম ৬/৮৪; হূদ ১১/৭১-৭৩; ইউসুফ ১২/৬; ইবরাহীম ১৪/৩৯; হিজর ১৫/৫১-৫৬=৭; মারিয়াম ১৯/৪৯-৫০; আম্বিয়া ২১/৭২-৭৩; আনকাবূত ২৯/২৭; ছাফফাত ৩৭/১১৩; ছোয়াদ ৩৮/৪৫-৪৭; যারিয়াত ৫১/২৪-৩০=৭। সর্বমোট =৩৪টি \ 

হযরত ইয়াকূব (আ:) | Prophet Yaqub | Nhrepon.com

হযরত ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম)



ইসহাক্ব (আঃ)-এর দুই যমজ পুত্র ঈছ ও ইয়াকূব-এর মধ্যে ছোট ছেলে ইয়াকূব নবী হন। ইয়াকূবের অপর নাম ছিল ‘ইস্রাঈল’। যার অর্থ আল্লাহর দাস। নবীগণের মধ্যে কেবল ইয়াকূব ও মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর দু’টি করে নাম ছিল। মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর অপর নাম ছিল ‘আহমাদ’ (ছফ ৬১/৬)।
ইয়াকূব তার মামুর বাড়ী ইরাকের হারান (حران) যাবার পথে রাত হয়ে গেলে কেন‘আনের অদূরে একস্থানে একটি পাথরের উপরে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন।
সে অবস্থায় স্বপ্ন দেখেন যে, একদল ফেরেশতা সেখান থেকে আসমানে উঠানামা করছে।
এরি মধ্যে আল্লাহ তাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন,


إنى سأبارك عليك واكثر ذريتك واجعل لك هذه الأرض ولعقبك من بعدك-


‘অতিসত্ত্বর আমি তোমার উপরে বরকত নাযিল করব, তোমার সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করে দেব, তোমাকে ও তোমার পরে তোমার উত্তরসূরীদের এই মাটির মালিক করে দেব’। তিনি ঘুম থেকে উঠে খুশী মনে মানত করলেন, যদি নিরাপদে নিজ পরিবারের কাছে ফিরে আসতে পারেন, তাহ’লে এই স্থানে তিনি একটি ইবাদতখানা প্রতিষ্ঠা করবেন এবং আল্লাহ তাকে যা রূযী দেবেন তার এক দশমাংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করবেন’।

অতঃপর তিনি ঐ স্থানে পাথরটির উপরে একটি চিহ্ন এঁকে দিলেন যাতে তিনি ফিরে এসে সেটাকে চিনতে পারেন। তিনি স্থানটির নাম রাখলেন, بيت إيل অর্থাৎ আল্লাহর ঘর। 

এই স্থানেই বর্তমানে ‘বায়তুল মুক্বাদ্দাস’ অবস্থিত, যা পরবর্তীতে প্রায় ১০০০ বছর পরে হযরত সুলায়মান (আঃ) পুনর্নির্মাণ করেন। মূলতঃ এটিই ছিল ‘বায়তুল মুক্বাদ্দাসের’ মূল ভিত্তি ভূমি, যা কা‘বা গৃহের চল্লিশ বছর পরে ফেরেশতাদের দ্বারা কিংবা আদম পুত্রদের হাতে কিংবা ইসহাক্ব (আঃ) কর্তৃক নির্মিত হয়।
নিশ্চিহ্ন হওয়ার কারণে আল্লাহ ইয়াকূব (আঃ)-কে স্বপ্নে দেখান এবং তাঁর হাতে সেখানে পুনরায় ইবাদতখানা তৈরী হয়।



ইস্রাঈলী বর্ণনা অনুযায়ী ইয়াকূব হারানে মামুর বাড়ীতে গিয়ে সেখানে তিনি তার মামাতো বোন ‘লাইয়া’ (ليّا) ও পরে ‘রাহীল’ (راحيل )-কে বিবাহ করেন এবং দু’জনের মোহরানা অনুযায়ী ৭+৭=১৪ বছর মামুর বাড়ীতে দুম্বা চরান। ইবরাহীমী শরী‘আতে দু’বোন একত্রে বিবাহ করা জায়েয ছিল।

পরে মূসা (আঃ)-এর শরী‘আতে এটা নিষিদ্ধ করা হয়। শেষোক্ত স্ত্রীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বসেরা সুন্দর পুরুষ ‘ইউসুফ’। অতঃপর দ্বিতীয় পুত্র বেনিয়ামীনের জন্মের পরেই তিনি মারা যান।

তাঁর কবর বেথেলহামে (بيت لحم) অবস্থিত এবং ‘ক্ববরে রাহীল’ নামে পরিচিত। পরে তিনি আরেক শ্যালিকাকে বিবাহ করেন। ইয়াকূবের ১২ পুত্রের মধ্যে ইউসুফ নবী হন। প্রথমা স্ত্রীর পুত্র লাভী (لاوى) -এর পঞ্চম অধঃস্তন পুরুষ মূসা ও হারূণ নবী হন। এভাবে ইয়াকূব (আঃ)-এর বংশেই নবীদের সিলসিলা জারি হয়ে যায়।

ইয়াকূব-এর অপর নাম ‘ইসরাঈল’ অনুযায়ী তাঁর বংশধরগণ ‘বনু ইস্রাঈল’ নামে পরিচিত হয়। হঠকারী ইহুদী-নাছারাগণ যাতে তারা ‘আল্লাহর দাস’ একথা বারবার স্মরণ করে, সেকারণ আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তাদেরকে ‘বনু ইস্রাঈল’ বলেই স্মরণ করেছেন।



হারান থেকে ২০ বছর পর ইয়াকূব তাঁর স্ত্রী-পরিজন সহ জন্মস্থান ‘হেবরনে’ ফিরে আসেন। যেখানে তাঁর দাদা ইবরাহীম ও পিতা ইসহাক্ব বসবাস করতেন। যা বর্তমানে ‘আল-খলীল’ নামে পরিচিত। পূর্বের মানত অনুসারে তিনি যথাস্থানে বায়তুল মুক্বাদ্দাস মসজিদ নির্মাণ করেন (ঐ)।



কেন‘আন-ফিলিস্তীন তথা শাম এলাকাতেই তাঁর নবুঅতের মিশন সীমায়িত থাকে। ইউসুফ কেন্দ্রিক তাঁর জীবনের বিশেষ ঘটনাবলী ইউসুফ (আঃ)-এর জীবনীতে আলোচিত হবে। তিনি ১৪৭ বছর বয়সে মিসরে মৃত্যুবরণ করেন এবং হেবরনে পিতা ইসহাক (আঃ)-এর কবরের পাশে সমাধিস্থ হন।



উল্লেখ্য যে, হযরত ইয়াকূব (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ১০টি সূরায় ৫৭টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।


ইয়াকূবের অছিয়ত:

কেন‘আন থেকে মিসরে আসার ১৭ বছর পর মতান্তরে ২৩ বছরের অধিক কাল পরে ইয়াকূবের মৃত্যু ঘনিয়ে এলে তিনি সন্তানদের কাছে ডেকে অছিয়ত করেন। সে অছিয়তটির মর্ম আল্লাহ নিজ যবানীতে বলেন, 

وَوَصَّى بِهَا إِبْرَاهِيْمُ بَنِيْهِ وَيَعْقُوْبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّيْنَ فَلاَ تَمُوْتُنَّ إَلاَّ وَأَنتُمْ مُّسْلِمُوْنَ - أَمْ كُنتُمْ شُهَدَآءَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوْبَ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيْهِ مَا تَعْبُدُوْنَ مِن بَعْدِي قَالُواْ نَعْبُدُ إِلَـهَكَ وَإِلَـهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيْمَ وَإِسْمَاعِيْلَ وَإِسْحَاقَ إِلَـهاً وَّاحِداً وَّنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُوْنَ- (البقرة ১৩৩)


‘এরই অছিয়ত করেছিল ইবরাহীম তার সন্তানদের এবং ইয়াকূবও যে, হে আমার সন্তানগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য দ্বীনকে মনোনীত করেছেন। অতএব তোমরা অবশ্যই মুসলিম না হয়ে মরো না’ (বাক্বারাহ ১৩২)। ‘তোমরা কি তখন উপস্থিত ছিলে, যখন ইয়াকূবের মৃত্যু ঘনিয়ে আসে? যখন সে সন্তানদের বলল, আমার পরে তোমরা কার ইবাদত করবে? তারা বলল, আমরা আপনার উপাস্য এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাক্বের উপাস্যের ইবাদত করব- যিনি একক উপাস্য এবং আমরা সবাই তাঁর প্রতি সমর্পিত’ (বাক্বারাহ ২/১৩৩)। 



শুরুতে বলা হয়েছে ‘এরই অছিয়ত করেছিলেন ইবরাহীম। কিন্তু সেটা কি ছিল? আল্লাহ বলেন, 



إِذْ قَالَ لَهُ رَبُّهُ أَسْلِمْ قَالَ أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِيْنَ- (البقرة ১৩১)- 



‘স্মরণ কর যখন তাকে তার পালনকর্তা বললেন, আত্মসমর্পণ কর। সে বলল, আমি বিশ্বপালকের প্রতি আত্মসমর্পণ করলাম’ (বাক্বারাহ ২/১৩১)। অর্থাৎ ইবরাহীমের অছিয়ত ছিল তাঁর সন্তানদের প্রতি ইসলামের। তাঁর পৌত্র ইয়াকূবেরও অছিয়ত ছিল স্বীয় সন্তানদের প্রতি ইসলামের। এজন্য ইবরাহীম তার অনুসারীদের নাম রেখেছিলেন- ‘মুসলিম’ বা আত্মসমর্পিত (হজ্জ ২২/৭৮)।
ইবরাহীম তাঁর অপর প্রার্থনায় মুসলিম-এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে فَمَن تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ، ‘যে ব্যক্তি আমার অনুসরণ করল, সে ব্যক্তি আমার দলভুক্ত। কিন্তু যে ব্যক্তি আমার অবাধ্যতা করল, তার বিষয়ে আল্লাহ তুমি ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (ইবরাহীম ১৪/৩৬)। 



বুঝা গেল যে, ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব প্রমুখ নবীগণের ধর্ম ছিল ‘ইসলাম’। তাদের মূল দাওয়াত ছিল তাওহীদ তথা আল্লাহর ইবাদতে একত্ব। শুধুমাত্র আল্লাহর স্বীকৃতির মধ্যে তা সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তাঁর বিধানের প্রতি আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের মধ্যেই তার যথার্থতা নিহিত ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে তাদের অনুসারী হবার দাবীদার ইহুদী-নাছারাগণ তাদের নবীগণের সেই অছিয়ত ভুলে যায় এবং অবাধ্যতা, যিদ ও হঠকারিতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়ে তারা আল্লাহর অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্ট (المغضوب والضآلين) জাতিতে পরিণত হয়। [4] 



ইবরাহীম ও ইয়াকূবের অছিয়তে এটা প্রমাণিত হয় যে, সন্তানের জন্য দুনিয়াবী ধন-সম্পদ রেখে যাওয়ার চাইতে তাদেরকে ঈমানী সম্পদে সম্পদশালী হওয়ার অছিয়ত করে যাওয়াই হ’ল দূরদর্শী পিতার প্রধানতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। 


যে প্রেম বিশ্ব জয় করতে জানে | nhrepon.com

যে প্রেম বিশ্ব জয় করতে জানে


মিশরের "লিমান তুররা" কারা হাসপাতালের চৌদ্দ শিকের দুইপাশে দাঁড়িয়ে বিয়ে হয়েছিলো দুজনের। বর একজন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত আসামী। অপরাধ অন্য কিছু নয়, মিশরের ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া। ১৯৫৪ সালে যাঁকে গ্রেফতার করে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে কিছুদিন পর ফাঁসি বাতিল করে যাবজ্জীবন দেয়া হয়। কনে খুব ভালো করেই জানতেন এখানে যাবজ্জীবন মানে ২৫ বছরের আগে মুক্তির কোনো সম্ভাবনা নেই। কারান্তরীণ ছেলের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব পাওয়ার পর অনেক ভেবে তিনি এই কঠিন সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হন।

বিয়ের কয়েকদিন পরের ঘটনা। সদ্য বিবাহিত এই যুবককে অমানবিক নির্যাতন করে "ক্বানা" নামক অন্য একটি কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হলো। এই "ক্বানা" কারাগারটি ছিলো রাজধানী কায়রো থেকে অনেক দূরের একটা জায়গা। যুবকের নবপরিণীতা বধু ননদকে সঙ্গে করে সেই কারাগারে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। পথিমধ্যে অনেক ভোগান্তি সহ্য করতে হলো দুজনকে। যুবকের বোন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলা শেষ করে ভাবিকে একান্তে কথা বলার সুযোগ করে দিলেন। যুবক তাঁর বধু ও বোনের পথিমধ্যে ভোগান্তির কথা জেনেছিলেন। তিনি অত্যন্ত আবেগ তাড়িত কণ্ঠে স্ত্রীকে বললেন, "দেখো, আমি আশাবাদী ছিলাম খুব অল্প দিনের মধ্যে হয়তো বের হতে পারবো। কিন্তু সেই সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ দেখতে পাচ্ছি। প্রেসিডেন্ট জামাল নাসের আমাদেরকে অফার করেছে, তাকে সাহায্য করলে সে আমাদের সসম্মানে মুক্তি দিয়ে দিবে। কিন্তু আমি বলে দিয়েছি, আমাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেললেও আমি তার অন্যায় প্রস্তাবে রাজি হবো না। প্রিয়তমা, আমি তোমাকে একটা অনুরোধ করি। আমার কারাগার থেকে মুক্তি পেতে হয়তো আরও অন্তত দুই দশক লেগে যাবে। তোমার এতো কষ্ট আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমার জন্য তোমার সুন্দর জীবনটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বরং তুমি এমন কাউকে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করো যে তোমার পাশে সবসময় থাকতে পারবে। তোমার জীবনটাকে সুখে আনন্দে ভরিয়ে তুলতে পারবে।"

স্ত্রী স্বামীর কথা শুনলেন। কিন্তু তিনি কিছু বলার আগেই কারারক্ষীরা কারার লৌহকপাট বন্ধ করে দিলো। তিনি বাড়ি ফিরে গিয়ে স্বামীকে উদ্দেশ্য করে একটি কবিতা লিখলেন। যার কিয়দংশ ছিলো এরকম,
"নিরন্তর পথ চেয়ে বসে আছি,
শুধু তোমার জন্য।
নাহয় সে পথ হোক জিহাদের।
লাল পথ ধরে পায়ে পায়ে
যাই চলো জান্নাতের দ্বারে।
সেই ওয়াদার খাতিরে,
ভয় কি?
লজ্জা কি?
কিসের বা বেদনা আমার?"

অবশেষে প্রায় ২০ বছর পর ১৯৭৩ সালে সেই যুবক মুক্তি পেলেন। ততদিনে বার্ধক্য এসে ভীড় করেছে। বিয়ের ২০ বছর পর প্রথমবারের মতো মুক্ত পৃথিবীতে প্রিয়তমা স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হলো। আল্লাহর দ্বীনকে ভালোবেসে জীবনের সবচেয়ে স্বর্ণ সময়গুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন থেকে যে দম্পতি ঈমানের এক অনন্যসাধারণ নজীর স্থাপন করলেন, মহাকালও হয়তো সেটা টুকে রাখলো। নীলনদের তীরে হয়তো বিশাল কোনো ঢেউ আঁচড়ে পড়ে সম্মান জানাতে চাইলো এ মজলুম দম্পতিকে। কায়রো শহরের পাখিগুলো হয়তো একবার কিচির মিচির ধ্বনি তুলে প্রকাশ করতে চাইলো তাদের আনন্দের কল্লোলিত বার্তা।

১৯৮১ সালের এক সন্ধ্যা। রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয়তম এই বান্দা-বান্দীকে আরেকটু পরীক্ষা করে ঈমানের চুড়ান্ত মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ করে নিতে চাইলেন বোধহয়। মিশরের ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম এ সিপাহসালারকে পুনরায় গ্রেফতার করা হলো। সম্পূর্ণ মিথ্যে এবং ভিত্তিহীন অভিযোগে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে শাহাদাৎ বরণ করানো হলো। শহীদের সম্মানিতা স্ত্রী এবার চিরদিনের মতো নিঃসঙ্গ হয়ে গেলেন। ১৯৮১ সালের ৬ নভেম্বর ভোরবেলা যে চুড়ান্ত নিঃসঙ্গ জীবনের যাত্রা শুরু হয়েছিলো, ২০০৭ সালের ৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় তার পরিসমাপ্তি ঘটলো। পরিসমাপ্তি ঘটলো একটি অনবদ্য অধ্যায়ের। এই মহীয়সী নারীর নাম আমিনা কুতুব। মিশরের ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষনেতা সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ (রহঃ) এর ছোটবোন। তাঁর স্বামী ইখওয়ানের অন্যতম নেতা শহীদ কামাল আল সানানিরী। আল্লাহকে যাঁরা সত্যিকার অর্থেই ভালোবাসতে পেরেছে, তাদের গল্পগুলো তো এমনই হবে। জাগতিক সব চাওয়া পাওয়ার হিসেব নিকেষ আর ঠুনকো স্বার্থবাদী চিন্তাধারা তাদের পদতলে এসে লুটিয়ে পড়ে আর্তনাদ করে ফিরবে বারবার। আর আল্লাহর পথের সেনানীরা তার উপরে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করে যাবেন, "সত্য সমাগত, মিথ্যা অপসৃত। আর মিথ্যা তো অপসৃত হবার জন্যই।" [সূরা বনী ইসরাইল-৮১]

"যে জীবন সাহসের আগ্নেয়গিরি"/ মু. লাবিব আহসান







collected from internet

হযরত আদম (আলাইহিস সালাম) | Nhrepon.com

হযরত আদম (আলাইহিস সালাম) 

Md-Nur-Hossain-repon
হযরত আদম (আ:) | Nhrepon


বিশ্ব ইতিহাসে প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী হিসাবে আল্লাহ পাক আদম (আলাইহিস সালাম)-কে নিজ দু’হাত দ্বারা সরাসরি সৃষ্টি করেন (ছোয়াদ ৩৮/৭৫)। মাটির সকল উপাদানের সার-নির্যাস একত্রিত করে আঠালো ও পোড়ামাটির ন্যায় শুষ্ক মাটির তৈরী সুন্দরতম অবয়বে রূহ ফুঁকে দিয়ে আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করেছেন।


অতঃপর আদমের পাঁজর থেকে তাঁর স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টি করেন।[2] আর এ কারণেই স্ত্রী জাতি স্বভাবগত ভাবেই পুরুষ জাতির অনুগামী ও পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট। অতঃপর স্বামী-স্ত্রীর মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে একই নিয়মে মানববংশ বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে।

আবদুল মুত্তালিব | সাহাবীদের জীবনী

আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) এর জীবনী

sahabider-jiboni

আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব | সাহাবীদের জীবনী

নাম আবুল ফজল আব্বাস। পিতা আবদুল মুত্তালিব, মাতা নাতিলা, মতান্তরে নাসিলা বিনতু খাব্‌বাব। রাসূলুল্লাহর সা. চাচা। তবে দু’জন ছিলেন প্রায় সমবয়সী। ঐতিহাসিকদের ধারণা, সম্ভবতঃ তিনি রাসূলুল্লাহর সা. দুই বা তিন বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

ছোট বেলায় একবার তিনি হারিয়ে যান। মা মান্নত মানেন, আব্বাস ফিরে এলে কা’বায় রেশমী গিলাফ চড়াবেন। কিছু দিন পর তিনি সহি-সালামতে ফিরে এলে অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে আবদুল মুত্তালিব তাঁর মান্নত পুরা করেন।

জাহিলী যুগে তিনি ছিলেন কুরাইশদের একজন প্রতাপশালী রঈস। পুরুষানুক্রমে খানায়ে কা’বার রক্ষণাবেক্ষণ ও হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্ব লাভ করেন।

রাসূলুল্লাহ সা. নবুওয়াত লাভ করলেন। মক্কায় প্রকাশ্যে তিনি তাওহীদের দাওয়াত দিতে লাগলেন। হযরত আব্বাস যদিও দীর্ঘ দিন যাবত প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেননি, তবে তিনি এ দাওয়াতের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।


এ কারণে মদীনার বাহাত্তর জন্য আনসার হজ্জের মওসুমে মক্কায় গিয়ে মিনার এক গোপন শিবিরে যে দিন রাসূলুল্লাহকে সা. মদীনায় হিজরাতের আহবান জানান এবং তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন, সেই গোপন বৈঠকেও হযরত আব্বাস উপস্থিত ছিলেন। তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। ইতিহাসে এ বাইয়াতকে আকাবার দ্বিতীয় শপথ বলা হয়। এ উপলক্ষে তিনি উপস্থিত মদীনাবাসীদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এক ভাষণে বলেনঃ ‘খাযরাজ কাওমের লোকেরা! আপনাদের জানা আছে, মুহাম্মাদ সা. স্বীয় গোত্রের মধ্যে সম্মান ও মর্যাদার সাথেই আছেন। শত্রুর মুকাবিলায় সর্বক্ষণ আমরা তাঁকে হিফাজত করেছি। এখন তিনি আপনাদের নিকট যেতে চান। যদি আপনারা জীবন পণ করে তাঁকে সহায়তা করতে পারেন তাহলে খুবই ভালো কথা। অন্যথায় এখনই সাফ সাফ বলে দিন।’ জবাবে মদীনাবাসীগণ পরিপূর্ণ সহায়তায় আশ্বাস দান করেন। এর অল্পকাল পরেই রাসূলুল্লাহ মদীনায় হিজরাত করেন।


মক্কার কুরাইশদের চাপের মুখে বাধ্য হয়ে তিনি কুরাইশ বাহিনীর সংগে বদর যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা. অবহিত ছিলেন, এ কারণে তিনি সাহাবীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘যুদ্ধের সময় আব্বাস বা বনু হাশিমের কেউ সামনে পড়ে গেলে তাদের হত্যা করবে না। কারণ, জোরপূর্বক তাদের রণক্ষেত্রে আনা হয়েছে।’


বদর যুদ্ধে অন্যান্য কুরাইশ মুশরিকদের সাথে আব্বাস, আকীল ও নাওফিল ইবন হারিস মুসলমানদের হাতে বন্দী হন। ঘটনাক্রমে, আব্বাসকে এত শক্তভাবে বাঁধা হয় যে, ব্যথায় তিনি কঁকাতে থাকেন। তাঁর সে কঁকানি রাসূলুল্লাহর সা. রাতের আরামে বিঘ্ন ঘটায়। একথা সাহাবায়ে কিরাম অবগত হলে তাঁরা আব্বাসের বাঁধন ঢিলা করে দেন। আব্বাস কঁকানি বন্ধ করে দিলেন। রাসূল সা. জিজ্ঞেস করলেনঃ কঁকানি শোনা যায় না কেন? বলা হলোঃ বাঁধন ঢিলা করে দেওয়া হয়েছে। তখুনি রাসূল সা. নির্দেশ দিলেন সকল বন্দীর বাঁধন ঢিলা করে দাও।


বদরের যুদ্ধবন্দীদের কাছে অতিরিক্ত কাপড় ছিল না। রাসূল সা. সকলকে পরিধেয় বস্ত্র দিলেন। হযরত আব্বাস ছিলেন দীর্ঘদেহী। কোন ব্যক্তির জামা তাঁর গায়ে লাগছিল না। আব্বাসের মত দীর্ঘদেহী ছিল মুনাফিক আবদুল্লাহ বিন উবাই। সে একটি জামা আব্বাসকে দান করে। এ কারণে মুনাফিক হওয়া সত্ত্বেও আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যুর পর পুত্রের অনুরোধে রাসূল সা. নিজের একটি জামা তার লাশের গায়ে পরানের জন্য দান করেন। এভাবে তিনি চাচার প্রতি কৃত ইহসান পরিশোধ করেন।


বদর যুদ্ধের কয়েদীদের মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। আব্বাসের জননী ছিলেন মদীনার আনসার-গোত্র খাযরাজের কন্যা। এ কারণে এ গোত্রের লোকেরা রসূলুল্লাহর সা. নিকট নিবেদন করলো, আব্বাস আমাদের ভাগ্নে। আমরা তাঁর মুক্তিপণ মাফ করে দিচ্ছি। কিন্তু সাম্যের পরিপন্থী হওয়ায় এ প্রস্তাব আল্লাহর রাসূলের নিকট গ্রহণযোগ্য হলো না। পক্ষান্তরে আব্বাস সম্পদশালী ব্যক্তি হওয়ার কারণে রাসূল সা. তাঁর নিকট মোটা অংকের মুক্তিপণ দাবী করেন।

আব্বাস এত বেশী অর্থ আদায়ে অক্ষমতা প্রকাশ করে বলেনঃ অন্তর থেকে আমি আগেই মুসলমান হয়েছিলাম। মুশরিকরা এ যুদ্ধে অংশ নিতে আমাকে বাধ্য করেছে। রাসূলুল্লাহ সা. বললেনঃ অন্তরের অবস্থা আল্লাহ জানেন। আপনার দাবী সত্য হলে আল্লাহ তার বিনিময় দেবেন। তবে বাহ্যিক অবস্থার বিচারে আপনাকে কোন প্রকার সুবিধা দেওয়া যাবে না। আর মুক্তিপণ আদায়ে আপনার অক্ষমতাও গ্রহণযোগ্য নয়।
কারণ, আমি জানি, মক্কায় উম্মুল ফজলের নিকট আপনি মোট অংকের অর্থ রেখে এসেছেন। বিস্ময়ের সাথে আব্বাস বলে উঠলেন, আল্লাহর কসম, আমি ও উম্মুল ফজল ছাড়া আর কেউ এ অর্থের কথা জানে না। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আপনি আল্লাহর রাসূল। অতঃপর তিনি নিজের, ভ্রাতুষ্পুত্র আকীল ও নাওফিল ইবন হারিসের পক্ষ থেকে মোটা অংকের মুক্তিপণ আদায় করে মুক্তি লাভ করেন।

আব্বাসের একটা দীর্ঘ সময় মক্কায় অবস্থান এবং প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা না দেওয়ার পশ্চাতে একা বিশেষ কারণ ছিল। তিনি সব সময় মক্কা থেকে কাফিরদের গতিবিধি রাসূলুল্লাহকে সা. অবহিত করতেন। তাছাড়া মক্কায় যেসব দুর্বল ঈমানের মুসলমান তখনো অবস্থান করছিল, তিনি ছিলেন তাদের ভরসাস্থল। এ কারণে একবার রাসূরুল্লাহর সা. নিকট হিজরাতের অনুমতি চাইলে তাঁকে এই বলে বিরত রাখেন যে, ‘আপনার মক্কায় অবস্থান করা শ্রেয়। যেভাবে আল্লাহ আমার উপর নবুওয়াত সমাপ্ত করেছেন তেমনি আপনার উপর হিজরাত সমাপ্ত করবেন।’

মক্কা বিজয়ের কিছুদিন পূর্বে হযরত আব্বাস হিজরাতের অনুমতি লাভ করেন। সপরিবারে রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হয়ে প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেন এবং স্থায়ীভাবে মদীনায় বসবাস শুরু করেন। তিনি মক্কা বিজয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। হুনাইন অভিযানে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে একই বাহনে আরোহী ছিলেন। তিনি বলেনঃ এ যুদ্ধে কাফিরদের জয় হলো এবং মুসলিম মুজাহিদরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়লো, রাসূল সা. বললেন, ‘আব্বাস, তীরন্দাজদের আওয়ায দাও।’ স্বভাবগতভাবেই আমি ছিলাম উচ্চকণ্ঠ। আহ্‌বান জানালামঃ আইনা আসহাবুল সুমরা’- তীরন্দাজরা কোথায়? আমার এই আওয়াযে মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল। তায়েফ অবরোধ, তাবুক অভিযান এবং বিদায় হজ্জেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন।

বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার পর রাসূল সা. অসুস্থ হয়ে পড়েন। দিন দিন অসুস্থতা বাড়তে থাকে। হযরত আলী, হযরত আব্বাস ও বনী হাশিমের অন্য লোকেরা রাসূলুল্লাহর সা. সেবার দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ওফাতের দিন হযরত আলী বাড়ীর বাইরে এলেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করলোঃ রাসূলুল্লাহর সা. অবস্থা কেমন? যেহেতু সে দিন অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছিল, এ কারণে তিনি বললেনঃ ‘আল্লাহর অনুগ্রহে একটু ভালো।’
 কিন্তু হযরত আব্বাস ছিলেন অভিজ্ঞ ব্যক্তি। তিনি আলীর একটি হাত ধরে বললেনঃ ‘তুমি কী মনে করেছো? আল্লাহর কসম, তিন দিন পরেই তোমরা গোলামী করতে শুরু করবে। আমি দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছি এ রোগেই অল্প দিনের মধ্যেই রাসুলুল্লাহ সা. ইনতিকাল করবেন। আমি আবদুল মুত্তালিব খান্দানের লোকদের চেহারা দেখেই তাদের মৃত্যু আন্দাজ করতে পারি।’


ঐ দিন রাসূল সা. ইনতিকাল করেন। হযরত আলী ও বনী হাশিমের অন্যান্যদের সহযোগিতায় হযরত আব্বাস কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করেন। যেহেতু তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. সম্মানিত চাচা এবং বনী হাশিমের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি, এ কারণে বহিরাগত লোকেরা তাঁর নিকট এসে শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করতে থাকে।


হযরত রাসূলে কারীম সা. চাচা আব্বাসকে খুব সম্মান করতেন। তাঁর সামান্য কষ্টতেও তিনি দারুণ দুঃখ পেতেন। একবার কুরাইশদের একটি আচরণ সম্পর্কে হযরত আব্বাস অভিযোগ করলে রাসূল সা. অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বললেনঃ ‘সেই সত্তার শপথ, যর হাতে আমার জীবন! যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূলের জন্য আপনাদের ভালবাসেনা তার অন্তরে ঈমানের নূর থাকবে না।’


একবার রাসূল সা. এক বৈঠকে আবু বকর ও উমারের রা. সাথে কথা বলছিলেন। এমন সময় আব্বাস উপস্থিত হলেন। রাসূল সা. তাঁকে নিজের ও আবু বকরের মাঝখানে বসালেন এবং কণ্ঠস্বর একটু নীচু করে কথা বলতে লাগলেন। আব্বাস চলে যাওয়ার পর আবু বকর রা. এমনটি করার কারণ জেজ্ঞেস করলেন। রাসূল সা. বলেনঃ ‘মর্যাদাবান ব্যক্তিই পারে মর্যাদাবান ব্যক্তির মর্যাদা দিতে।’ তিনি আরো বলেনঃ ‘জিবরীল আমাকে বলেছেন, আব্বাস উপস্থিত হলে আমি যেন আমার স্বর নিচু করি, যেমন আমার সামনে তোমাদের স্বর নিচু করার নির্দেশ তিনি দিয়েছেন।’


হযরত রাসূলে করীমের সা. পর পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীন হযরত আব্বাসের যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়েছেন। হযরত উমার ও হযরত উসমান রা. ঘোড়ার উপর সওয়ার হয়ে তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাঁর সম্মানার্থে ঘোড়া থেকে নেমে পড়তেন এবং বলতেনঃ ‘ইনি হচ্ছেন রাসূলুল্লাহর সা. চাচা।’ হযরত আবু বকর রা. একমাত্র আব্বাসকেই নিজে আসন থেকে সরে গিয়ে স্থান করে দিতেন।

হযরত আব্বাস ৩২ হিজরীর রজব/মুহাররম মাসের ১২ তারিখ ৮৮ (অষ্টাশি) বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান রা. জানাযার নামায পড়ান এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. কবরে নেমে তাঁকে সমাহিত করেন। মদীনার বাকী গোরস্তানে তাঁকে দাফন করা হয়। তিনি ইসলাম গ্রহণের পর ৩২ বছর এবং জাহিলী যুগে ৫৬ বছর জীবন লাভ করেন।

জাহিলী যুগে হযরত আব্বাস রা. অত্যন্ত সম্পদশালী ছিলেন। এ কারণে বদর যুদ্ধের সময় রাসূল সা. তাঁর নিকট থেকে মুক্তিপণ স্বরূপ বিশ উকিয়া স্বর্ণ গ্রহণ করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল তাঁর জীবিকার উৎস। সুদের কারবারও করতেন। মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত এ কারবার চালু ছিল। দশম হিজরীর বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক ভাষণে রাসূল সা. বলেনঃ ‘আজ থেকে আরবের সকল প্রকার সুদী কারবার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো এবং সর্বপ্রথম আমি আব্বাস ইবন আবদিল মুত্তালিবের সুদী কারবার রহিত ঘোষণা করছি।’

সুদের কারবার বন্ধ হওয়ার পর রাসূল সা. গণীমতের এক পঞ্চমাংশ ও ফিদাক বাগিচার আমদানী থেকে তাঁকে সাহায্য করতেন। রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর তিনি ও হযরত ফাতিমা প্রথম খলীফার নিকট রাসূলুল্লাহর সা. উত্তরাধিকার দাবী করেন। নবীরা কোন উত্তরাধিকার রেখে যান না- এ সম্পর্কিত রসূলুল্লাহর সা. একটি বাণী হযরত আবু বকরের রা. মুখ থেকে শোনার পর তাঁরা নীরব হয়ে যান।


হযরত আব্বাস ছিলেন অত্যন্ত দানশীল। অতিথি পরায়ণ ও দয়ালু। হযরত সাদ ইবন আবী ওয়াক্‌কাস রা. বলেনঃ ‘আব্বাস হলেন আল্লাহর রাসূলের চাচা, কুরাইশদের মধ্যে সর্বাধিক দরাজ হস্ত এবং আত্মীয় স্বজনের প্রতি অধিক মনোযোগী’। তিনি ছিলেন কোমল অন্তর বিশিষ্ট। দুআর জন্য হাত উঠালেই চোখ থেকে অশ্রুর বন্যা বয়ে যেত। এ কারণে তাঁর দুআয় এক বিশেষ আছর পরিলক্ষিত হতো।’

রাসূলুল্লাহ সা. আব্বাস রা. ও তাঁর সন্তানদের জন্য দুআ করেছেন। তিনি তাঁদের সকল প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অপরাধের মাগফিরাত কামনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সা. থেকে তিনি বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর থেকে বহু সাহাবী ও তাবেয়ী হাদীস বর্ণনা করেছেন।

হযরত আব্বাসের মধ্যে কাব্য প্রতিভাও ছিল। হুনাইন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তিনি একটি কবিতায় ব্যক্ত করেছেন। তার কয়েকটি পংক্তি ‘আল-ইসতিয়াব’ ও ইবন ইসহাকের সীরাত গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে।

লেখক: মুহাম্মাদ আব্দুল মা’বুদ

উৎস: আসহাবে রাসূলের জীবনকথা

অনুলিখন: এম.এ. ইমরান




collected from:  waytojannah.com

ইমাম আবু হানিফা রহঃ এর জীবনী | Nhrepon.com

ইমাম আবু হানিফা রহঃ

Imam-abu-hanifa
ইমাম আবু হানিফা (র:) এর জীবনী

ভূমিকা

যুগে যুগে যে সকল মণীষীরা এ ধরাপৃষ্ঠে আগমন করেছিলেন তাদের মাঝে ইমাম আবু হানিফা রহঃ ছিলেন অন্যতম।

জন্ম ও বংশ পরিচয়:
তার পূর্ণ নাম হল- আবু হানীফা আন নু’মান ইবনি সাবিত নোমান {যুতি বা যাওতী } ইবনে মুরযেবান । প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী ইমাম আবু হানিফা ইরাকের কুফায় ৫ সেপ্টেম্বর ৬৯৯ ইংরেজী মোতাবেক ৮০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ

ফেরিওয়ালা থেকে সেরা করদাতা | Nhrepon.com

ফেরিওয়ালা থেকে সেরা করদাতা


সদ্য লোকসানে পড়া বাবার পক্ষে একটি সাইকেল ক্রয় করা সম্ভব ছিল না। তাই ৪ কি.মি. পথ পায়ে হেটে টিউশনি করতেন তৌহিদ হোসেন। আজ তিনি অনেকের প্রেরণার উৎস। খুচরা যন্ত্রাংশ কাঁধে বয়ে বেড়ানো তৌহিদ হোসেনের যাত্রা ছিল অনিশ্চিত। কিন্তু কে জানত? তার সেই যাত্রাই হবে
সাফল্যের স্বপ্নযাত্রা। সেই তৌহিদ এবারহয়েছেন রংপুর অঞ্চলের তরুণ সেরা করদাতা। শুধু তাই নয়, তার স্ত্রী সাবা পারভীন নেহাও হয়েছেন তরুণ সেরা করদাতা।

সোমবার রংপুর জেলা পরিষদ কমিউনিটি সেন্টারে তাদের রাষ্ট্রীয় এই সেরা করদাতার সম্মাননা স্মারক তুলে দেন রংপুর সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। এই উদ্যোক্তার সংগ্রাম মুখর বেড়ে উঠার গল্প উঠে এসেছে ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপচারিতায়।

তৌহিদ হোসেন জানান, ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত সেন্ট সায়মুন কিন্ডার গার্টেনে (বর্তমানে ল কলেজ) বাবার গাড়িতে করে স্কুলে যেতাম। কিন্তু বাবার ব্যবসায়িক লোকসানের কারণে সব ফিকে হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে ভর্তি হই গুপ্তপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। সেখান থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ভর্তি হই রংপুর হাই স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে। সংসারের দৈন্যদশার কারণেই শুরু করি টিউশনি। প্রথম মাসের টিউশনের সম্মানী ২০০ টাকা পাওয়ার পর তা দিয়ে মাকে শাড়ি কিনে দেই। সেই শাড়ি পেয়ে আমার মায়ের সেই খুশি মুখ আমাকে এখনও তাড়া করে বেড়ায়। পড়ালেখা ও টিউশনির পাশাপাশি আমি সংসারের আর্থিক অনটন কিভাবে কাটানো যায় সেই চিন্তা করতে থাকি।

তৌহিদ হোসেন বলেন, আমার ফুফা নাইয়ার আজম ছিলেন মোটরসাইকেল পার্টস ব্যবসায়ী। সপ্তম শ্রেণিতে উঠা মাত্রই একদিন আমার মা আমার ফুফাকে অনুরোধ করেন, ভাই সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। আমার ছেলেটাকে ব্যবসা শেখাও। কিন্তু বয়স অল্পের কারণে প্রথমে ফুফা তাতে রাজি হলেন না। পরে একদিন আবারও মা আমাকে ফুফার কাছে নিয়ে গিয়ে একই আবদার করলেন। এবার ফুফা কথা ফেলতে পারলেন না। আমাকে ব্যবসা শেখাতে রাজি হলেন। আমার ডিউটি পরলো ফুফার ব্যাগ কাঁধে নিয়ে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার প্রতিটি উপজেলায় ফুফার সঙ্গে যাওয়া।

তিনি আরো জানান, সেই থেকে শুরু হলো ব্যবসা শেখার পালা। ফুফার সঙ্গে তার ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সকালে যেতাম। ফিরতাম রাতে। বাসায় আসার সময় ফুফা আমাকে ১০০ টাকা দিতেন দিন হাজিরা। এভাবে একবছর তার পেছনে ঘুরে মোটরসাইকেল পার্টসের নাম, অর্ডার নেওয়া ও ডেলিভারি সিস্টেম শিখে ফেললাম। এর মধ্যে লেখাপড়াও চালাতে থাকলাম। অষ্টম শ্রেণিতে উঠে আমি ফুফাকে বললাম আমাকে আপনি যন্ত্রাংশ দাম কেটে দেন। আমি নিজে ব্যবসা করি। ফুফা আমার সাহস দেখে আমাকে উৎসাহিত করলেন।

তিনি প্রথম দিন আমাকে ১৩ হাজার টাকার যন্ত্রাংশ দর কেটে দিয়ে বিক্রির জন্য দিলেন। সেই যন্ত্রাংশ আমি মিঠাপুকুর, শঠিবাড়ি ও বড় দরগায় গিয়ে বিক্রি করে প্রথম দিনে ১ হাজার ১৮০ টাকা মুনাফা করি। সেই টাকা মায়ের হাতে এনে দেই। এভাবে এক বছর ফুফার কাছ থেকে যন্ত্রাংশ ক্রয় করে বিক্রি করি। বছর ঘুরতেই পুঁজি দাঁড়ায় দেড় লাখ টাকায়। এরপর আমি ফুফার সহযোগিতায় যশোর ও ঢাকা থেকে মহাজনদের কাছ থেকে মাল ক্রয় করে এনে জেলায় জেলায় উপজেলায় উপজেলায় ফেরি করে বিক্রি শুরু করি।

ফেরি করে পার্টস বিক্রি করতে গিয়ে নানা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তৌহিদ হোসেন বলেন, একদিন দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে মালামাল বিক্রি করে সৈয়দপুরের বাস ধরার জন্য স্ট্যান্ডে আসি। দেখি শেষ গাড়িটিও ছেড়ে দিচ্ছে। তখন এক মন ওজনের মালামালের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দৌড়ে গিয়ে বাসের পেছনের ছাদের উপরে ওঠার সিঁড়িতে লাফিয়ে উঠি। ওই বাসটিতে ছাদেও জায়গা ছিল না। খাঁচা ভর্তি মাছ ছিল। বাস রাস্তায় গিয়ে ব্রেক কষলে সেই মাছের পানি মাথাসহ সারা শরীরে পরে ভিজে যায়। এভাবে বার বার ভিজে ভিজে সৈয়দপুর আসি। সেখান থেকে রংপুর আসার জন্য আরেকটি বাসে উঠি। কিন্তু আমার শরীরের মাছের আঁশটে গন্ধ পুরো বাসে ছড়িয়ে পড়ে। যাত্রীরা আপত্তি করলে তারাগঞ্জে এসে সুপারভাইজার আমাকে নামিয়ে দেয়। বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার পর সেদিন মাঝ পথে খুব কেঁদেছিলাম।

তৌহিদ হোসেন বলেন, অনেক দিন গেছে পার্বতীপুর থেকে মালামাল বিক্রি করে ক্লান্ত শরীরে রাত ১১টায় ট্রেনে উঠেই ঘুমিয়ে গেছি। ঘুম ভাঙ্গার পর দেখি আমি কাউনিয়া স্টেশনে। কি আর করা, অগত্যা ব্যাগে থাকা বই নিয়ে প্লাটফর্মের লাইটের আলোতে পড়া শুরু করি। পাশাপাশি ব্যাগে থাকা যন্ত্রাংশ আগলে রাখি। ভোরবেলা অন্য ট্রেনে রংপুর ফিরি। আবার মায়ের সঙ্গে দেখা করে ১০টার দিকে ব্যাগে যন্ত্রাংশ ও বই নিয়ে যাত্রা শুরু করি। এভাবে নির্ঘুম রাত, বিশ্রামহীন দিন গেছে পার্টস ফেরি করে বিক্রি করতে আমার।

তিনি বলেন, আমার পিঠের ব্যাগে পার্টস ছাড়াও ক্লাসের নির্দিষ্ট বই ছিল। সময় পেলেই রাস্তায়, ট্রেনে, দোকানে, পড়ালেখা করেছি। দশম শ্রেণিতে ১৮৪ জন শিক্ষার্থীর মাঝে ১ম স্থান অধিকার করি। এরপর সেখান থেকে এসএসসি এবং রংপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করি। পাশাপাশি চলতে থাকে ফেরি করে পার্টস বিক্রি করা।

তৌহিদ হোসেন জানান, ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ব্যবসায় সময় দিতে গিয়ে আমার খাওয়ার কোন শিডিউল ছিল না। যা খেতাম তা বমি হয়ে যেতো। তারপর চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে তারা বলেন, আমার আলসার হয়েছে, যা মরণব্যাধি ক্যান্সারে পরিণত হওয়ার শঙ্কা ছিল। চিকিৎসকরা পাকস্থলী থেকে দুটি পলিপ অপসারণ করে ক্যান্সার পরীক্ষার জন্য পাঠায়। ৭ দিন পর রিপোর্ট আসার কথা। ওই ৭ দিন প্রতিটি মুহূর্ত ছিল একেক বছরের সমান। শুধুই কাঁদতাম আর ভাবতাম ক্যান্সার হয়, তাহলে আমার এত পরিশ্রমের লালিত স্বপ্নের কি হবে। তখন মৃত্যুটাকে খুব সহজ মনে হলো আমার কাছে। এরপর রিপোর্ট ভালো আসা মাত্র নামাজ শুরু করি, আজীবন যেন পড়তে পারি সেই প্রতিজ্ঞা করি।

তিনি বলেন, আমি মনে করি ইচ্ছের সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম এবং সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে চেষ্টা করলে সফলকাম হওয়া যায়। যা আমি আল্লাহর রহমতে করতে সক্ষম হয়েছি। আমার ইচ্ছা দেশের তরুণ সমাজ শুধু চাকরির চেষ্টা না করুক। তারা ব্যবসার চিন্তাও করুক। আমার ইচ্ছা কর্মসংস্থান সৃষ্টির।



Collected from bijoytimes24.com

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান এর বায়োগ্রাফি.


দুধ বিক্রির জমানো ৮ টাকা দিয়ে পান-বিড়ির দোকান দেই!

আতিউর রহমান
আতিউর রহমান

একটা গাভী আর কয়েকটা খাসি আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা
পর্যন্ত ওগুলো মাঠে চরাতাম। বিকেল বেলা গাভীর দুধ নিয়ে বাজারে গিয়ে
বিক্রি করতাম। দুধ বিক্রির আয় থেকে সঞ্চিত আট টাকা দিয়ে আমি পান-বিড়ির
দোকান দেই।
আমার জন্ম জামালপুর জেলার এক অজপাড়াগাঁয়ে। ১৪ কিলোমিটার দূরের শহরে
যেতে হতো পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে চড়ে। পুরো গ্রামের মধ্যে একমাত্র মেট্রিক
পাস ছিলেন আমার চাচা মফিজউদ্দিন। আমার বাবা একজন অতি দরিদ্র ভূমিহীন কৃষক।
আমরা পাঁচ ভাই, তিন বোন। কোনরকমে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতো আমাদের।
আমার দাদার আর্থিক অবস্থা ছিলো মোটামুটি। কিন্তু তিনি আমার বাবাকে তাঁর
বাড়িতে ঠাঁই দেননি। দাদার বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে একটা ছনের ঘরে আমরা
এতগুলো ভাই-বোন আর বাবা-মা থাকতাম।
মা তাঁর বাবার বাড়ি থেকে নানার সম্পত্তির সামান্য অংশ পেয়েছিলেন। তাতে
তিন বিঘা জমি কেনা হয়। চাষাবাদের জন্য অনুপযুক্ত ওই জমিতে বহু কষ্টে বাবা
যা ফলাতেন, তাতে বছরে ৫/৬ মাসের খাবার জুটতো। দারিদ্র্য কী জিনিস, তা আমি
মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি- খাবার নেই, পরনের কাপড় নেই; কী এক অবস্থা !
আমার মা সামান্য লেখাপড়া জানতেন। তাঁর কাছেই আমার পড়াশোনার হাতেখড়ি।
তারপর বাড়ির পাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। কিন্তু আমার পরিবারে
এতটাই অভাব যে, আমি যখন তৃতীয় শ্রেণীতে উঠলাম, তখন আর পড়াশোনা চালিয়ে
যাওয়ার সুযোগ থাকলো না। বড় ভাই আরো আগে স্কুল ছেড়ে কাজে ঢুকেছেন। আমাকেও
লেখাপড়া ছেড়ে রোজগারের পথে নামতে হলো।
আমাদের একটা গাভী আর কয়েকটা খাসি ছিল। আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত
ওগুলো মাঠে চরাতাম। বিকেল বেলা গাভীর দুধ নিয়ে বাজারে গিয়ে বিক্রি করতাম।
এভাবে দুই ভাই মিলে যা আয় করতাম, তাতে কোনরকমে দিন কাটছিল।
কিছুদিন চলার পর দুধ বিক্রির আয় থেকে সঞ্চিত আট টাকা দিয়ে আমি
পান-বিড়ির দোকান দেই। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানে বসতাম।
পড়াশোনা তো বন্ধই, আদৌ করবো- সেই স্বপ্নও ছিল না !
এক বিকেলে বড় ভাই বললেন, আজ স্কুল মাঠে নাটক হবে। স্পষ্ট মনে আছে, তখন
আমার গায়ে দেওয়ার মতো কোন জামা নেই। খালি গা আর লুঙ্গি পরে আমি ভাইয়ের
সঙ্গে নাটক দেখতে চলেছি।
স্কুলে পৌঁছে আমি তো বিস্ময়ে হতবাক ! চারদিকে এত আনন্দময় চমৎকার
পরিবেশ ! আমার মনে হলো, আমিও তো আর সবার মতোই হতে পারতাম। সিদ্ধান্ত নিলাম,
আমাকে আবার স্কুলে ফিরে আসতে হবে।
নাটক দেখে বাড়ি ফেরার পথে বড় ভাইকে বললাম, আমি কি আবার স্কুলে ফিরে
আসতে পারি না ? আমার বলার ভঙ্গি বা করুণ চাহনি দেখেই হোক কিংবা অন্য কোন
কারণেই হোক কথাটা ভাইয়ের মনে ধরলো। তিনি বললেন, ঠিক আছে কাল হেডস্যারের
সঙ্গে আলাপ করবো।
পরদিন দুই ভাই আবার স্কুলে গেলাম। বড় ভাই আমাকে হেডস্যারের রুমের বাইরে
দাঁড় করিয়ে রেখে ভিতরে গেলেন। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট শুনছি, ভাই
বলছেন আমাকে যেন বার্ষিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগটুকু দেওয়া হয়।
কিন্তু হেডস্যার অবজ্ঞার ভঙ্গিতে বললেন, সবাইকে দিয়ে কি লেখাপড়া হয়!
স্যারের কথা শুনে আমার মাথা নিচু হয়ে গেল।
যতখানি আশা নিয়ে স্কুলে গিয়েছিলাম, স্যারের এক কথাতেই সব ধুলিস্মাৎ
হয়ে গেল। তবু বড় ভাই অনেক পীড়াপীড়ি করে আমার পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি
যোগাড় করলেন। পরীক্ষার তখন আর মাত্র তিন মাস বাকি।
বাড়ি ফিরে মাকে বললাম, আমাকে তিন মাসের ছুটি দিতে হবে। আমি আর এখানে
থাকবো না। কারণ ঘরে খাবার নেই, পরনে কাপড় নেই- আমার কোন বইও নেই, কিন্তু
আমাকে পরীক্ষায় পাস করতে হবে।
মা বললেন, কোথায় যাবি ? বললাম, আমার এককালের সহপাঠী এবং এখন ক্লাসের
ফার্স্টবয় মোজাম্মেলের বাড়িতে যাবো। ওর মায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। যে
ক’দিন কথা বলেছি, তাতে করে খুব ভালো মানুষ বলে মনে হয়েছে। আমার বিশ্বাস,
আমাকে উনি ফিরিয়ে দিতে পারবেন না।
দুরু দুরু মনে মোজাম্মেলের বাড়ি গেলাম। সবকিছু খুলে বলতেই খালাম্মা
সানন্দে রাজি হলেন। আমার খাবার আর আশ্রয় জুটলো; শুরু হলো নতুন জীবন। নতুন
করে পড়াশোনা শুরু করলাম। প্রতিক্ষণেই হেডস্যারের সেই অবজ্ঞাসূচক কথা মনে
পড়ে যায়, জেদ কাজ করে মনে; আরো ভালো করে পড়াশোনা করি।
যথাসময়ে পরীক্ষা শুরু হলো। আমি এক-একটি পরীক্ষা শেষ করছি আর ক্রমেই যেন
উজ্জীবিত হচ্ছি। আমার আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যাচ্ছে। ফল প্রকাশের দিন আমি
স্কুলে গিয়ে প্রথম সারিতে বসলাম। হেডস্যার ফলাফল নিয়ে এলেন।
আমি লক্ষ্য করলাম, পড়তে গিয়ে তিনি কেমন যেন দ্বিধান্বিত। আড়চোখে আমার
দিকে তাকাচ্ছেন। তারপর ফল ঘোষণা করলেন। আমি প্রথম হয়েছি ! খবর শুনে বড়
ভাই আনন্দে কেঁদে ফেললেন। শুধু আমি নির্বিকার- যেন এটাই হওয়ার কথা ছিল।
বাড়ি ফেরার পথে সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। আমি আর আমার ভাই গর্বিত ভঙ্গিতে
হেঁটে আসছি। আর পিছনে এক দল ছেলেমেয়ে আমাকে নিয়ে হৈ চৈ করছে, স্লোগান
দিচ্ছে। সারা গাঁয়ে সাড়া পড়ে
নিয়ে এসে আমাকে দেখালেন। ওইটা ছিল ক্যাডেট কলেজে ভর্তির বিজ্ঞাপন।
যথাসময়ে ফরম পুরণ করে পাঠালাম। এখানে বলা দরকার, আমার নাম ছিল আতাউর
রহমান।
কিন্তু ক্যাডেট কলেজের ভর্তি ফরমে স্কুলের হেডস্যার আমার নাম আতিউর
রহমান লিখে চাচাকে বলেছিলেন, এই ছেলে একদিন অনেক বড় কিছু হবে। দেশে অনেক
আতাউর আছে। ওর নামটা একটু আলাদা হওয়া দরকার; তাই আতিউর করে দিলাম।
আমি রাত জেগে পড়াশোনা করে প্রস্তুতি নিলাম। নির্ধারিত দিনে চাচার সঙ্গে
পরীক্ষা দিতে রওনা হলাম। ওই আমার জীবনে প্রথম ময়মনসিংহ যাওয়া। গিয়ে
সবকিছু দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ ! এত এত ছেলের মধ্যে আমিই কেবল পায়জামা আর
স্পঞ্জ পরে এসেছি !
আমার মনে হলো, না আসাটাই ভালো ছিল। অহেতুক কষ্ট করলাম। যাই হোক পরীক্ষা
দিলাম; ভাবলাম হবে না। কিন্তু দুই মাস পর চিঠি পেলাম, আমি নির্বাচিত
হয়েছি। এখন চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে যেতে হবে।
সবাই খুব খুশি; কেবল আমিই হতাশ। আমার একটা প্যান্ট নেই, যেটা পরে যাবো।
শেষে স্কুলের কেরানি কানাই লাল বিশ্বাসের ফুলপ্যান্টটা ধার করলাম। আর একটা
শার্ট যোগাড় হলো।
আমি আর চাচা অচেনা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম। চাচা শিখিয়ে দিলেন, মৌখিক
পরীক্ষা দিতে গিয়ে আমি যেন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলি: ম্যা আই কাম ইন
স্যার ? ঠিকমতোই বললাম। তবে এত উচ্চস্বরে বললাম যে, উপস্থিত সবাই হো হো করে
হেসে উঠলো।
পরীক্ষকদের একজন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ এম. ডাব্লিউ. পিট
আমাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে সবকিছু আঁচ করে ফেললেন। পরম স্নেহে তিনি
আমাকে বসালেন। মুহূর্তের মধ্যে তিনি আমার খুব আপন হয়ে গেলেন। আমার মনে
হলো, তিনি থাকলে আমার কোন ভয় নেই।
পিট স্যার আমার লিখিত পরীক্ষার খাতায় চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর অন্য
পরীক্ষকদের সঙ্গে ইংরেজিতে কী-সব আলাপ করলেন। আমি সবটা না বুঝলেও আঁচ করতে
পারলাম যে, আমাকে তাঁদের পছন্দ হয়েছে।
তবে তাঁরা কিছুই বললেন না। পরদিন ঢাকা শহর ঘুরে দেখে বাড়ি ফিরে এলাম।
যথারীতি পড়াশোনায় মনোনিবেশ করলাম। কারণ আমি ধরেই নিয়েছি, আমার চান্স হবে
না।
হঠাৎ তিন মাস পর চিঠি এলো। আমি চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছি। মাসে ১৫০
টাকা বেতন লাগবে। এর মধ্যে ১০০ টাকা বৃত্তি দেওয়া হবে, বাকি ৫০ টাকা আমার
পরিবারকে যোগান দিতে হবে।
চিঠি পড়ে মন ভেঙে গেল। যেখানে আমার পরিবারের তিনবেলা খাওয়ার নিশ্চয়তা
নেই, আমি চাচার বাড়িতে মানুষ হচ্ছি, সেখানে প্রতিমাসে ৫০ টাকা বেতন
যোগানোর কথা চিন্তাও করা যায় না !
এই যখন অবস্থা, তখন প্রথমবারের মতো আমার দাদা সরব হলেন। এত বছর পর নাতির
(আমার) খোঁজ নিলেন। আমাকে অন্য চাচাদের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, তোমরা
থাকতে নাতি আমার এত ভালো সুযোগ পেয়েও পড়তে পারবে না ?
কিন্তু তাঁদের অবস্থাও খুব বেশি ভালো ছিল না। তাঁরা বললেন, একবার না হয়
৫০ টাকা যোগাড় করে দেবো, কিন্তু প্রতি মাসে তো সম্ভব নয়। দাদাও বিষয়টা
বুঝলেন।
আমি আর কোন আশার আলো দেখতে না পেয়ে সেই ফয়েজ মৌলভী স্যারের কাছে
গেলাম। তিনি বললেন, আমি থাকতে কোন চিন্তা করবে না। পরদিন আরো দুইজন সহকর্মী
আর আমাকে নিয়ে তিনি হাটে গেলেন।
সেখানে গামছা পেতে দোকানে দোকানে ঘুরলেন। সবাইকে বিস্তারিত বলে সাহায্য
চাইলেন। সবাই সাধ্য মতো আট আনা, চার আনা, এক টাকা, দুই টাকা দিলেন। সব
মিলিয়ে ১৫০ টাকা হলো।
আর চাচারা দিলেন ৫০ টাকা। এই সামান্য টাকা সম্বল করে আমি মির্জাপুর
ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হলাম। যাতায়াত খরচ বাদ দিয়ে আমি ১৫০ টাকায় তিন
মাসের বেতন পরিশোধ করলাম। শুরু হলো অন্য এক জীবন।
প্রথম দিনেই এম. ডাব্লিউ. পিট স্যার আমাকে দেখতে এলেন। আমি সবকিছু খুলে
বললাম। আরো জানালাম যে, যেহেতু আমার আর বেতন দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাই তিন
মাস পর ক্যাডেট কলেজ ছেড়ে চলে যেতে হবে।
সব শুনে স্যার আমার বিষয়টা বোর্ড মিটিঙে তুললেন এবং পুরো ১৫০ টাকাই
বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিলেন। সেই থেকে আমাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
এস.এস.সি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে পঞ্চম স্থান অধিকার করলাম এবং আরো অনেক
সাফল্যের মুকুট যোগ হলো।
আমার জীবনটা সাধারণ মানুষের অনুদানে ভরপুর। পরবর্তীকালে আমি আমার
এলাকায় স্কুল করেছি, কলেজ করেছি। যখন যাকে যতটা পারি, সাধ্যমতো সাহায্য
সহযোগিতাও করি। কিন্তু সেই যে হাট থেকে তোলা ১৫০ টাকা; সেই ঋণ আজও শোধ
হয়নি। আমার সমগ্র জীবন উৎসর্গ করলেও সেই ঋণ শোধ হবে না!



collected from uddoktarkhoje.com

হযরত মূসা (আঃ) এর জীবনী | Biography of Musa nobi | Nhrepon.com





হযরত মূসা (আঃ)



(খ্রীষ্ট পূর্ব ত্রয়োদশ শতাব্দী)

প্রাচীন মিসরের রাজধানী ছিল পেণ্টাটিউক। নিল নদের তীরে এই নগরে বাস করতেন মিসরের “ফেরাউন” রামেসিস। নগরের শেষ প্রান্তে ইহুদীদের বসতি। মিসরের ফেরাউন ছিলেন ইহুদীদের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন। 

একবার কয়েক জন জ্যোতিষী গণনা করে তাকে বলেছিলেন, ইহুদী পরিবারের মধ্যে এমন এক সন্তান জন্ম গ্রহণ করবে যে ভবিষ্যতে মিশরের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।


জ্যোতিষীদের কথা শুনে ভীত হয়ে পড়লেন ফেরাউন। তাই ফেরাউন আদেশ ‍দিলেন কোন ইহুদী পরিবারে সন্তান জন্ম গ্রহণ করলেই যেন হত্যা করা হয়।


ফেরাউন এর গুপ্তচররা চার দিকে ঘুরে বেড়াত। যখনই কোন পরিবারে সন্তাস জন্মাবার সংবাদ পেত তখনই গিয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করত।


ইহুদী মহল্লায় বাস করতেন আসরাম আর জোশিবেদ নামে এক সদ্য বিবাহিত দম্পতি। যথা সময়ে জোসিবেদের একটি পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করল। 

সন্তান জন্মাবার পরই স্বামী-স্ত্রীর মনে হল যেমন করেই হোক এই সন্তান কে রক্ষা করতে হবে। কে বলতে পারে এই সন্তানই হয়ত ইহুদী জাতিকে সমস্ত নির্যাতন থেকে রক্ষা করবে একদিন।



সকলের চোখের আড়ালে সম্পূর্ণ গোপনে শিশু সন্তান কে বড় করে তুলতে লাগলেন আসরাপ আর জোশিবেদ। কিন্তু বেশি দিন এই সংবাদ গোপন রাখা গেল না। 

স্বামী-স্ত্রী বুঝতে পারলেন যে কোন মুহূর্তে ফেরাউনের সৈনিকরা এসে তাদের সন্তান কে তুলে নিয়ে যাবে।

ইশ্বর আর ভাগ্যের হাতে শিশুকে সঁপে দিয়ে দুজন বেরিয়ে পড়লেন। নীল নদের তীরে এক নির্জন ঘাটে এসে শিশুকে সুইয়ে ‍দিয়ে তারা বাড়ি ফিরে গেলেন।



সেই নদীর ঘাটে প্রতিদিন গোসল করতে আসত ফেরাউনের স্ত্রী। ফুটফটে সুন্দর একটা বাচ্চাকে একা পড়ে থাকতে দেখে তার মায়া হল। তাকে তুলে নিয়ে এল রাজপ্রাসাদে। 

তার পর সেই শিশু সন্তানকে নিজের সন্তানের মত স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করে তুলতে লাগল। রাণী শিশুর নাম রাখল মূসা।


এ বিষয়ে আরেকটি কাহিনী প্রচলিত। মূসার মা জোশিবেদ জানতেন প্রতিদিন ফেরাউনের স্ত্রী সখিদের নিয়ে নদীতে স্নান করতে আসেন। 

একদিন পথের ধারে শিশু মূসাকে একটা ঝুড়িতে করে শুইয়ে রেখে দিলেন। নিজে গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইলেন। 

কিছুক্ষন পর রাণী সেই পথ দিয়ে স্নান করতে যাবার সময় দেখতে পেল মূসাকে। পথের পাশে ফুটফুটে একটা শিশুকে পড়ে থাকতে দেখে তার মায়া হল।

তাড়াতাড়ি মূসাকে কোলে তুলে নিল। জোশিবেদকেই মূসার ধাত্রী হিসেবে নিয়োগ করে রাজকুমারী। 

নিজের পরিচয় গোপন করে রাজপ্রাসাদে মূসাকে দেখা শুনা করতে থাকে জোশিবেদ। মা ছাড়া মূসা আর কোনা নারীর স্তন্য পান করেনি।


ধীরে ধীরে কৈশর থেকে যৌবনে পা দিলেন মূসা। ফেরাউনের অত্যাচার বেড়েই চলছিল। ইহুদিদের উপর এ অত্যাচার ভালো লাগত না মূসার। 

পুত্রের মনোভাব জানতে পেরে একদিন জোশিবেদ তার কাছে নিজের পরিচয় দিলেন। তার পর থেকে মূসার অন্তরে শুরু হল নিধারুন যন্ত্রনা।


একদিন রাজপথ ‍দিয়ে যাচ্ছিলেন মূসা। এমন সময় তার চোখে পড়ল এক হতভাগ্য ইহুদিকে নির্মমভাবে প্রহার করছে তার মিসরীয় মনিব। 

এই দৃশ্য দেখে আর স্থির থাকতে পারলেন না মূসা। তিনি সেই ইহুদিকে উদ্ধার করার জন্য নিজের হাতে তরবারী দিয়ে আঘাত করলেন মিসরীর মনিবকে। 

সেই আঘাতে মারা গেল মিসরীয় লোকটি। ইহুদী লোকটি চার দিকে এ কথা টি প্রকাশ করে দিল। গুপ্ত চররা ফেরাউনকে গিয়ে সংবাদ টি দিতেই ক্রোধে ফেটে পড়লেন ফেরাউন।

তিনি বুঝতে পারলেন রাজকন্যা মূসাকে মানুষ করলেও তার শরীরে বইছে ইহুদী রক্ত, তাই নিজের ধর্মের মানুষের উপর অত্যাচার হতে দেখে মিসরীয় কে হত্যা করেছে। 

একে যদি মুক্ত রাখা হয় তাহলে বিপদ অবশ্যম্ভাবী। তখনই সৈনিকদের ডেকে হুকুম দিলেন, যেখান থেকে হোক মূসাকে বন্দী করে নিয়ে এস।


ফেরাউনের আদেশ শুনে আর বিলম্ভ করলেন না মূসা। তৎক্ষনাৎ নগর ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়লেন মূসা।

দীর্ঘ পথ শ্রমে মূসা ক্লান্ত, তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ছিলেন। তার চোখে পড়ল দূরে একটি কুয়ো। কুয়োর সামনে সাতটি মেয়ে তাদের ভেঁড়া গুলো কে পানি খাওয়াচ্ছিল। 

হঠাৎ একদল মেষ পালক সেখানে এসে মেয়েদের কাছ থেকে জোর করে ভেঁড়া গুলিকে কেড়ে নিল। সাথে সাথে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিল সাত বোন। 


তাদের চিৎকার শুনে ছুটে এলেন মূসা। তার পর মেষ পালকদের কাছ থেকে সব কটা ভেঁড়া উদ্ধার করে মেয়েদের ফিরিয়ে দিলেন। মেয়েরা তাকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়ি ফিরে গেল।

সাত বোনের বাবার নাম ছিল রুয়েন। তারা বাড়ি পিরে তাদের বাবাকে সব ঘটনা খুলে বলল। তাদের বাবা তাদের কে বললেন পরদিন মূসার সাথে দেখা হলে তাকে বাড়িতে ডেকে আনতে।

পরদিন সাত বোন এসে মূসাকে তাদের বাবার আমন্ত্রনের কথা জানাল। মূসা তাদের কথা মত তাদের বাবার আমন্ত্রনে তাদের সাথে বাড়িতে গেলেন। 

তার পরনের মূল্যবান পোশাক, সম্ভ্রমপূর্ণ ব্যবহার দেখে সকলেই মুগ্ধ হয়ে গেল। রুয়েন তার পরিচয় জিজ্ঞেস করতেই কোন কথা গোপন করলেন না মূসা। অকপটে নিজের পরিচয় বলে দিলেন।

রুয়েন তাকে চিনতে পারলেন এবং তার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে তাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিলেন। কিছুদিন পর একমেয়ের সাথে তার বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। 

মূসা রাজি হয়ে গেলেন এবং রুয়েনের এক মেয়ের সাথে মূসার বিবাহ সম্পন্ন হলো।

তাদের সাথে থাকতে থাকতে অল্প কিছুদিনের মধ্যে মেষ চরানো শিখে পেললেন মূসা। এক নতুন পরিবেশের সাথে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে মানেয়ে নিলেন। 

দেখতে দেখতে বেশ কয়েক বছর কেটে গেল। ও দিকে মিশরে ইহুদিদের অবস্থা ক্রমশই দূর্বিসহ হয়ে উঠেছিল। এখানে পশু পালকের জীবন যাপন করলেও স্বজাতীর কথা ভুলতে পারেন নি মূসা। মাঝে মাঝেই তার সমস্ত অন্তর ব্যথিত হয়ে উঠত।

একদিন মেষের পাল নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে নির্জন পাহাড়ের প্রান্তে এসে পৌঁছলেন মূসা। সামনেই বেশ কিছু গাছ পালা। হঠাৎ মূসা দেখলেন সেই গাছ পালা আর পাহাড়ের মধ্য থেকে এক আলোকছটা বেরিয়ে এল। 

এক তীব্র আলো মনে হল দুচোখ যেন জলসে যাচ্ছে। তবুও তিনি স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন সেই আলোর দিকে। তার মনে হলো ঐ আলো যেন তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। 

এক সময় শুনতে পেলেন সেই আলোর মধ্য থেকে এক অলৌকিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, মূসা....মূসা....।

চমকে উঠলেন মূসা। কেউ তারই নাম ধরে ডাকছে। তৎক্ষনাৎ সাড়া দিলেন, কে আপনি আমায় ডাকছেন? সেই অলৌকিক কণ্ঠস্বর বলে উঠল, আমি তোমার ও তোমার পূর্ব পুরুষদের একমাত্র ঈশ্বর।

ঈশ্বর তার সাথে কথা বলছেন, এ যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না মূসা। ভীত হয়ে মাটিতে নতজানু হয়ে বসে পড়লেন। আমার কাছে আপনার কি প্রয়োজন প্রভু?

দৈব কণ্ঠস্বর বলল, তুমি আমার প্রতিনিধি হিসেবে মিশরে যাও। সেখানে ইহুদিরা অমানুষিক নির্যাতন ভোগ করছে। তুমি ইহুদিদের মুক্ত করে নতুন দেশে নিয়ে যাবে।

মূসা বললেন আমি কেমন করে তাদের মুক্ত করব?

দৈববাণী বলল, আমি অদৃশ্যভাবে তোমাকে সাহায্য করব। তুমি ফেরাউনের কাছে গিয়ে বলবে, আমিই তোমাকে প্রেরণ করেছি। সকলেই যেন তোমার আদেশ মেনে চলে।

মূসা বললেন, কিন্তু যখন তারা জিজ্ঞেস করবে ঈশ্বরের নাম তখন কি জবাব দিব?

প্রথমেই ঈশ্বর তার নাম প্রকাশ না করলেও পরে তিনি বললেন তিনি এই বিশ্ব জগতের স্রষ্টা আল্লাহ।

মূসা অনুভব করলেন তার নিজের শক্তিতে নয়, আল্লাহ প্রদত্ত শক্তিতেই তাকে সমস্ত কাজ সমাধান করতে হবে। এতদিন আল্লাহ সম্বন্ধে তার কোন স্পষ্ট ধারণা ছিল না। 

এই প্রথম অনুভব করলেন আল্লাহর নির্দিষ্ট কাজের জন্যই তিনি পৃথিবীতে এসেছেন। আর আল্লাহ তার একমাত্র ঈশ্বর।

এর কয়েকদিন পর দ্বিতীয়বার ঈশ্বরের আদেশ পেলেন মূসা। তিনি পূনরায় আবির্ভূত হলেন মূসার সামনে। তার পর বললেন তোমার উপর আমি প্রসন্ন হয়েছি। 

তুমিই পারবে ইহুদি জাতিকে এই সংকট থেকে উদ্ধার করতে। আর বিলম্ব কর না, যত শীঘ্র সম্ভব রওনা হও মিশরে। 

অল্প কয়েকদিন পর স্ত্রী-সন্তানদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মিশরের পথে যাত্রা করলেন মূসা।

যথাসময়ে মিশরে গিয়ে পৌছলেন মূসা। গিয়ে দেখলেন সত্যি সত্যিই ইহুদিরা অবর্ণনীয় দুরবস্থার মধ্যে বাস করছে।

মূসা প্রথমেই সাক্ষাৎ করলেন ইহুদিদের প্রধান নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে। তাদের সকলকে বললেন ঈশ্বরের আদেশের কথা। 

মূসার আচার-আচরণ, তার ব্যক্তিত্ব, আন্তারিক ব্যবহার, গভীর আত্মপ্রত্যয় দেখে সকলেই তাকে বিশ্বাস করল।

মূসা বললেন, আমরা ফেরাউনের কাছে গিয়ে দেশ ত্যাগ করার অনুমতি প্রার্থনা করব। মূসা তার ভাই এ্যাবন ও কয়েকজন ইহুদি নেতাকে সাথে নিয়ে হাজির হলেন ফেরাউনের দরবারে। 

মূসা জানতেন সরাসরি দেশত্যাগের অনুমতি চাইলে কখনই ফেরাউন সেই অনুমতি দেবে না। তাই তিনি বললেন, সম্রাট, আমাদের স্রষ্টা আদেশ দিয়েছেন, সমস্ত ইহুদিকে মরুপ্রান্তরে এক পাহাড়ে গিয়ে প্রার্থনা করতে। আপনি যদি কয়েক দিনের জন্য সেখানে যাবার অনুমতি দেন।

ফেরাউন মূসার অনুরোধে সাড়া দিলেন। ক্রুদ্ধ স্বরে বলে উঠলেন, তোমাদের আল্লাহর আদেশ আমি মানি না। তোমরা মিশর ত্যাগ করে কোথাও যেতে পারবে না।

মূসা বললেন, আমরা যদি মরুভূমিতে গিয়ে প্রার্থনা না করি তবে তিনি আমাদের উপর ক্রুদ্ধ হবেন। হয়ত আমাদের সকলকে ধ্বংস করে ফেলবেন।

ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে এলেন মূসা। কি করবেন কিছুই ভাবতে পারছিলেন না। শেষে নিরুপায় হয়ে আল্লাহর কাছে আকুল হয়ে প্রার্থনা করলেন। 

তার প্রার্থনায় সাড়া দিলেন আল্লাহ। তিনি মূসা কে বললেন, তোমার ভাই এ্যারন কে বল, সে যেন নদী, জলাশয়, পুকুর, ঝর্নায় গিয়ে তার জাদু দন্ড স্পর্শ করে, তাহলেই দেখবে সমস্ত পানি রক্ত হয়ে গিয়েছে।

আল্লাহর নির্দেশে এ্যারন মিসরের সমস্ত পানীয় জল কে রক্তে রুপান্তরিত করে ফেলল। ফেরাউন আদেশ দিলেন মাটি খুড়ে পানি বার কর।

সৈনিকরা অসংখ্য কূপ খুঁড়ে ফেলল। সকলে সেই জল পান করতে আরম্ভ করল। এ্যারনের জাদু বিফল বিফল হতেই মূসা পুনরায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন।

এই মিশর জুড়ে ব্যাঙের মহামারী দেখা গেল। তার পঁচা গন্ধে লোকের প্রানান্তরক অবস্থা। কেউ আর ঘরে থাকতে পারে না। 

সকলে গিয়ে ফেরাউনের কাছে নালিশ জানাল। নিরুপায় হয়ে ফেরাউন ডেকে পাঠালেন মূসাকে। বললেন, তুমি ব্যঙের মড়ক বন্ধ কর। আমি তোমাদের মরুভূমিতে গিয়ে প্রার্থনা করার অনুমতি দেব।

মূসার ইচ্ছায় ব্যঙের মড়ক বন্ধ হলেও, ফেরাউন নানা অজুহাতে ইহুদিদের যাওয়ার অনুমতি দিলেন না। নিরুপায় হয়ে মূসা আবার আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন। 

ফেরাউনের এই আচরণে এইবার ভয়ংকর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন আল্লাহ। সমস্ত মিশর জুড়ে শুরু হল ঝড়-ঝঞ্ঝা বৃষ্টি মহামারী। তবুও ফেরাউন অনুমতি দিতে চান না।

এইবার আল্লাহ নির্মম অস্ত্র প্রয়োগ করলেন। হঠাৎ সমস্ত মিশরীয়দের প্রথম পুত্র সন্তান মারা পড়ল। দেশ জুড়ে শুরু হল হাহাকার। 

সমস্ত মিশরীয়রা দলবদ্ধভাবে ফেরাউনের কাছে গিয়ে দাবি জানাল, ইহুদিদের দেশ ছাড়ার অনুমতি দিন। না হলে আরও কি গুরুতর সর্বনাশ হবে কে জানে।

ভয় পেয়ে গেলেন ফেরাউন। ফেরাউন মূসা কে ডেকে বললেন, প্রার্থনা করার জন্য তোমাদের কে মরুভূমিতে যাবার অনুমতি দিচ্ছি। 

যদি মনে কর তোমাদের যা কিছু আছে, গৃহপালিত গবাদি পশু, জীবজন্তু, জিনিস পত্র সব সাথে নিয়ে যেতে পার।

দেশত্যাগের অনুমতি পেয়ে ইহুদিরা সবাই আনন্দে উল্লাসিত হয়ে উঠল। তারা সকলেই মূসাকে তাদের নেতা বলে স্বীকার করে নিল।

মিশর ছাড়াও মাকুম নগরে বহু ইহুদি বাস করত। সকলে দলবদ্ধভাবে মূসাকে অনুসরণ করল।

মূসা জানতেন আল্লাহর শাস্তির ভয়ে ফেরাউন দেশ ত্যাগের অনুমতি দিলেও, তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করবেন যাতে তাদের যাত্রা পথে বাধা সৃষ্টি করা যায়। তাই যথা সম্ভব সতর্কভাবে পথ চলতে লাগলেন।

কয়েকদিন চলার পর তারা সকলেই এসে পড়ল লোহিত সাগরের তীরে।

এদিকে ইহুদিরা মিশর ত্যাগ করতেই ফেরাউনের পরিবর্তন ঘটল। যেমন করে তাদের ফিরিয়ে নিয়ে এসে ক্রীতদাসে পরিণত করতে হবে। তৎক্ষণাৎ ইহুদিদের বন্দি করবার জন্য বিশাল এক সৈন্যবাহিনীকে পাঠালেন ফেরাউন।

এদিকে দূর থেকে মিশরীয় সৈন্যদের দেখতে পেয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ল সমস্ত ইহুদিরা। সামান্যতম বিচলিত হলেন না মূসা।

প্রার্থনায় বসলেন মূসা। প্রর্থনা শেষ হতেই দৈব বাণী হল, মূসা, তোমার হাতের দণ্ড তুলে সমুদ্রের মধ্য দিয়ে যাবে তোমাদের কে সমুদ্রের পানি স্পর্শ করবে না।

মূসা তার হাতের দণ্ড তুলে সমুদ্রের সামনে এসে দাঁড়াতেই সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। তার মধ্য দিয়ে প্রসারিত হয়েছে প্রশান্ত পথ। সকলের আগে মূসা রওনা হলেন। তার পিছনে সমস্ত নারী-পুরুষের দল সেই পথ ধরে এগিয়ে চলল। 

তারা কিছুদূর যেতেই মিশরীয় সৈন্যরা এসে পড়ল সমুদ্রের তীরে। ইহুদিদের সমুদ্রের মাঝখান দিয়ে যেতে দেখে তারাও তাদের অনুসরণ করে সেই পথ ধরে এগিয়ে চলল। 

সমস্ত মিশরীয় বাহিনী নেমে আসতেই আল্লাহর নির্দেশ শুনতে পেলেন মূসা, তোমার হাতের দণ্ড পিছনে পিরে নামিয়ে দাও। মূসা তার হাতের দণ্ড নিচু করতেই সমুদ্রের জলরাশি এসে আছরে পড়ল মিশরীয় সৈন্যদের উপর। 

মুহূর্তেই বিশাল সৈন্য বাহিনী সমুদ্রের অতল গহরে হারিয়ে গেল। ইতিমধ্যে ইহুদিরা নিরাপদে তীরে গিয়ে পৌছলেন। মূসা সকলকে নিয়ে এগিয়ে চললেন। 

সামনে বিশাল মরুভূমি। সামান্য পথ অতিক্রম করতেই তাদের সঞ্চিত পানি এবং খাবার ফুরিয়ে গেল। 

মরুভূমির বুকে কোথাও পানির চিহ্ন মাত্র নেই। ক্রমশই সকলে তৃষ্ণার্ত এবং ক্ষুদার্ত হয়ে পড়ছিল। অনেকে আর অগ্রসর হতে চাইছিল না।

মূসা বিচলিত হয়ে পড়লেন। এত গুলো মানুষ কে কোথা থেকে তৃষ্ণার পানি দিবেন। কিছুদূর যেতেই এক যায়গায় পানি পাওয়া গেল। 

এত দূর্গন্ধ সেই পানি কার সাধ্য তা মুখে দেয়। প্রার্থনায় বসলেন মূসা। প্রার্থনা শেষ করে আল্লাহর নির্দেশে কিছু গাছের পাতা ফেলে দিলেন সেই পানির মধ্যে। 

সাথে সাথে সেই পানি সুস্বাধু পানিয় হয়ে উঠল। সকলে তৃষ্ণা মিটিয়ে সব পাত্র ভলে নিল। যারা মূসা কে দোষারপ করছিল, তারা অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা ভিক্ষা চাইল। 

সকলে মূসা কে তাদের ধর্ম গুরু এবং নেতা হিসেবে স্বীকার করে নিল। সকলে তার নির্দেশ মতে এগিয়ে চলল। কিছুদিনের মধ্যে সমস্ত খাবার ফুরিয়ে গেল। 

আসে পাশে কোথাও কোন খাবারের সন্ধান পাওয়া গেল না। খিদের জ্বালায় সকলে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। আবার তারা দোষারপ করতে আরম্ভ করল মূসাকে। তোমার জন্যই আমাদের এত কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে।

মূসা সকলকে শান্ত করে বললেন, তোমরা ভুলে গেছ আমাদের রব আল্লাহর কথা? তিনে ফেরাউনকে তোমাদের দেশ ত্যাগের অনুমতি দিতে বাধ্য করেছেন। 

তিনি সমুদ্র কে দ্বিখণ্ডিত করেছেন, সৈন্যদের হাত থেকে তোমাদের কে রক্ষা করেছেন। তোমাদের জন্য পানির ব্যবস্থা করেছেন। তবুও তোমরা তার শক্তিতে সন্দেহ প্রকাশ করছ।

মূসার কথা শেষ হতেই কোথা হতে সেখানে উড়ে আসে অসংখ্য পাখির ঝাঁক। ইহুদিরা ইচ্ছা মত পাখি মেরে মাংস খায়। আর কারও মনে কোন সংশয় থাকে না। 

মূসা তাদের অবিসংবাদিত নেতা। সকলে শপথ করে জীবনে মরনে তারা মূসার সমস্ত আদেশ মেনে চলবে।

মূসা সমস্ত ইহুদিদের নিয়ে এলেন এফিডিম নামে এক নির্জন প্রান্তে। চারদিকে ধু ধু বালি, মাঝে মাঝে ছোট পাহাড়, কোথাও পানির কোন উৎস নাই।







স্যার আইজ্যাক নিউটন | sir isaac newton life | Nhrepon.com


স্যার আইজ্যাক নিউটন

(the life of isaac newton)


(isaac newton born and death) জন্ম: ১৬৪২ এবং মৃত্যু: ১৭২৭


sir-isaac-newton
sir isaac newton


১৬৪২ সালের বড় দিনে আইজাক নিউটন ( isaac newton ) জন্ম গ্রহন করেন। তার জন্মের কয়েক মাস আগেই পিতার মৃত্যু হয়। জন্মের সময় নিউটন (newton) ছিলেন খুব দুর্বল শীর্ণকায় আর ক্ষুদ্র আকৃতির। ধাই তার জীবনের আশা সম্পুর্ণ ত্যাগ করেছিল। হয়ত বিশ্বের প্রয়োজনেই বিশ্ববিধাতা তার প্রাণ রক্ষা করেছিলেন।





বিধবা মায়ের সাথেই নিউটনের জীবনের প্রথম তিন বছর কেটে যায়। এই সময় তাঁর মা বারনাবাস নামে এক ভদ্রলোকের প্রেমে পড়ে তাকে বিবাহ করেন। নব বিবাহিত দম্পতির জীবনে শিশু নেহাতই অবাঞ্ছিত বিবেচনা করে মা শিশু নিউটন কে তাঁর দাদীর কাছে রেখে দেন।





১২ বছর বয়সে নিউটন কে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হলো। জন্ম থেকেই রুগ্ন ছিলেন নিউটন। তবু তার দুষ্টুমি কিছু কম ছিল না। কিন্তু শিক্ষকরা সকলেই তার অসাধারণ মেধার জন্য ভালোবাসতেন। স্কুলের অধ্যক্ষের শালা প্রায়ই স্কুলে পৌছতে দেরি করত।





isaac newton inventions:- একদিন নিউটন বললেন, স্যার, আমি আপনার জন্য ঘড়ি তৈরি করে দিচ্ছি, তাহলে ঘড়ি দেখে ঠিক সময়েই স্কুলে আসতে পারবেন। নিউটন ঘড়ি তৈরি করলেন। ঘড়ির উপরে থাকত পানির পাত্র। প্রতি দিন নির্দিষ্ট পরিমান পানি সেই পাত্রে ঢেলে দেওয়া হত। তাঁর থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঘড়ির কাঁটার উপর পড়ত এবং ঘড়ির কাঁটা আপন গতিতেই এগিয়ে চলত।





ভাগ্যের পরিহাসে নিউটনের সৎ বাবা মারা গেলেন। মার একার পক্ষে ক্ষেত জমি জমা দেখা শুনা করা সম্ভব হল না। স্কুল ছাড়িয়ে চৌদ্দ বছরের নিউটন কে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এলেন। ভাগ্য ক্রমে চাচা উইলিয়াম ভাইপোর জ্ঞান তৃষ্ণায় মুগ্ধ হয়ে নিজের কাছে নিয়ে এলেন।





চাচা কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ভাইপোকে আবার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। এক বছর পর নিউটন ট্রিনিটি কলেজে ভর্তি হন। শুরু হল এক নতুন জীবন। ছাত্র হিসেবে নিউটন ছিলেন যেমন অধ্যবসয়ী, পরিশ্রমী তেমনি অসাধরণ মেধাসম্পন্ন।





তাঁর সব চেয়ে বেশি দখল ছিল অংকে। যে কোন জটিল অঙ্কের সমাধান খুব সহজেই করে ফেলতেন। তবুও অঙ্কের প্রতি তাঁর কোন  আকর্ষণ ছিল না। প্রকৃতির দূর্গেয় রহস্য তাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করত। নিউটন বিশ্বাস করতেন একমাত্র বিজ্ঞানের মাধ্যমেই প্রকৃতির এই গোপন রহস্য কে উদঘাটন করা সম্ভব। অবশেষে ১৯৬৫ সালে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন।





কলেজে ছাত্র থাকা কালীন অবস্থাতেই তিনি অঙ্ক শাস্ত্রের কিছু জটিল তথ্যের আবিষ্কার করেন- বাইনমিয়াল থিওরেম (Binomial theoream) ফ্লাক্সন (Fluxious) যা বর্তমানে ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস (Interegal calculus) নামে পরিচিত।



এছাড়া কঠিন পদার্থের ঘনত্ব ( The mathod for calculating the area of curves or the volume of solids.)।







১৯৬৬ সাল-এই সময় নিউটন একটি চিঠিতে লিখেছেন আমি (Fluxious) পদ্ধতি উদ্ভাবনের সাথে সাথেই মধ্যাকর্ষণ শক্তির সম্বন্ধে চিন্তা ভাবনা করতে শুরু করেছি। ভাবতে অবাক লাগে তখন নিউটনের কয়স মাত্র চব্বিশ।



নিউটন চাঁদ ও অন্যান্য গ্রহ নক্ষত্রের গতি নির্ণয় করতে সচেষ্ট হন। কিন্তু তার উদ্ভাবিত তত্ত্বের মধ্যে কিছু ভুল ত্রুটি থাকার জন্য তাঁর প্রচেষ্টা অসম্পুর্ণ ও ভুল থেকে যায়।



এই সব অসাধারণ কাজে ও মৌলিক তত্ত্বের জন্য সেই তরুন বয়সেই নিউটনের খ্যাতি পন্ডিত মহলে ছড়িয়ে পড়ল। ১৯৬৭ সালে তার কৃতিত্বের জন্য ট্রিনিটি কলেজ তাকে ফেলো হিসেবে নির্বাচন করলেন। একজন ২৫ বছরের তরুনের পক্ষে এ এক দূর্লভ সম্মান।



এইবার তিনি আলোর প্রকৃতি ও তার গতি পথ নিয়ে গবেষনার কাজ শুরু করলেন এবং এই কাজের প্রয়োজনেই তিনি তৈরি করলেন প্রতিফলক টেলিস্কোপ ( Reflecting telescope)। পরবর্তীকালে মহাকাশ সংক্রান্ত গবেষণার প্রয়োজনে যে উন্নত ধরনের টেলিস্কোপ আবিস্কৃত হয়, তিনিই তার অগ্রগামী পথিক।



নিউটন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রিনিটি কলেজের গনিতের অধ্যাপক হিসেবে নির্বাচিত হলেন। সেই সাথে আলোর বর্ণচ্ছাটা নিয়ে গবেষণার কাজ আরম্ভ করলেন। ইংল্যান্ডের রয়াল সোসাইটি ও নিউটনের বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে মুগ্ধ হয়ে তাকে সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত করলেন। তখন তার বয়স মাত্র ২৯।





ইংল্যান্ডের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের পাশে তার স্থান হল। সোসাইটির প্রথম সভায় তার আলোকতত্ত্ব নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ করলেন। তার বিষয়বস্তুর সাথে একমত হতে না পারলেও সোসাইটির সমস্ত বিজ্ঞানীই উচ্চ কন্ঠে তার বৈজ্ঞানিক নিবন্ধের প্রসংসা করলেন। তিনি যেন এক আত্মমগ্ন সাধক।





নিজের স্বপ্নে হয়ে আছেন। নিজের বেশবাশ সাজগোজ কোন দিকেই ভ্রুক্ষেপ নেই। প্রায়ই দেখা যেত তিনি কলেজে আসছেন, তার জামার বোতাম খোলা, পায়ের মোজা গুটিয়ে আছে, এলোমেলো চুল। তন্ময় হয়ে চলেছেন কোন নতুন বৈজ্ঞানিক ভাবনায় বিভোর হয়ে।



কল্পনা প্রবণ এই মনের জন্যই বাস্তব জগত সম্বন্ধে তাঁর ধারনা ছিল অস্পষ্ট। একদিন একজন লোক তার বাড়িতে এসে একটা প্রিজম ( তিন কোনা কাঁচ) দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল এর দাম কত হতে পারে? পিজমের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব বিবেচনা করে নিউটন বললেন, এর মূল্য নির্ণয় করা আমার সাধ্যের বাহিরে। লোকটি নিউটনের কথা শুনে অস্বাভিক বেশি দামে প্রিজম টি বিক্রি করতে চাইল। কোন দরদাম না করে সেই দামে প্রিজম টি কিনে নিলেন নিউটন। নিউটনের বাড়িওয়ালা সব কথা শুনে বললেন, তুমি নেহাতই বোকা। এটা সাধারণ একটা কাঁচ, এই কাঁচের যা ওজন হবে সেই দামে এটা কেনা উচিত ছিল।



নিউটিন কোন কথা না বলে শুধু হাসলেন। পরবর্তী কালে এই প্রিজম থেকেই উদ্ভাবন করেন বর্ণ তত্ত্ব (Theory of colour)।



কলেজের ছুটির অবকাশে মায়ের কাছে গিয়েছেন নিউটন। দিনের বেশির ভাগ সময় বাগানের মধ্যে বসে থাকেন। প্রাণ ভরে উপভোগ করেন প্রকৃতির রুপ রস গন্ধ। একদিন হঠাৎ সামনে খসে পড়ল একটা আপেল। মুহূর্তে তার মনের কোণে উকি মারে এক জিজ্ঞাসা- কেন আপেল টি আকাশে না উঠে মাটিতে পড়ল? এই জিজ্ঞাসাই মানুষের চিন্তার জগতে এক যুগান্তর নিয়ে এল। জন্ম নিল মধ্যাকর্ষণ তত্ত্বের ।





যদিও এই চেন্তার সূত্রপাত হয়েছিল বহু পূর্বেই। তার পূর্ণ পরিনতি ঘটল ১৬৮৭ সালে। নিউটন প্রকাশ করলেন তার কালজয়ী গ্রন্থ ( Mathemetical principles of natural philosophy) । মানুষ মধ্যাকর্ষণ শক্তির কথা সামান্য জানলেও এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে রয়েছে যে তার অস্তিত্ব সে কথা কেউ জানত না। মধ্যাকর্ষণ শক্তির এই আকর্ষণ গ্রহ নক্ষত্র পৃথিবী কে একসূত্রে বেধে রেখেছে। একদিন রাতে এক বন্ধুর বাড়িতে তার নিমন্ত্রন হয়েছে। কাজ করতে করতে রাত হয়ে গিয়েছে।





হঠাৎ তার মনে পড়ল বন্ধুর বাড়িতে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বার হলেন নিউটন। যখন বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে পৌছলেন তখন গভীর রাত। চার‍দিক অন্ধকার। নিউটন বঝতে পারলেন নিমন্ত্রন পর্ব আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে। বাড়ি পিরে এসে আবার কাজে বসলেন। রাতে খাওয়ার কথা মনেই হলো না তার।



এই নিরলস গবেষনার মধ্যে দিয়েই নিউটন প্রমান করলেন, If the force varied as the invers square, the orbit would be an elips with the entire of the force in one focus- এই আবিষ্কারের মাধ্যমে মধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার কাজ সহজ সাধ্য হলো। এতদিন মানুষের জানা ছিল না চন্দ্র সূর্যের সঠিক আয়তন। নিউটন তা নির্ণয় করলেন।



প্রতিষ্ঠা হলো মধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব। এই তত্ত্বের যাবতীয় বিবরণ তিনি লিখলেন তার প্রিন্সিপিয়া গ্রন্থ টিতে ( Principia Mathematics) । যখন এই বই প্রকাশিত হলো তখন অধিকাংশ মানুষের কাছেই মনে হলো এই বই যেমন জটিল তেমনি দূর্বোধ্য। নিউটনের এক দার্শনিক বন্ধু একদিন নিউটন কে জিজ্ঞেস করলেন, কিভাবে তোমার লেখার অর্থ বোঝা সম্ভব?



নিউটন তাকে একটি বইয়ের তালিকা দিয়ে বললেন, আপনি আগে এই বই গুলো পড়ুন তাহলে আমার তত্ত্ব বোঝার কাজ সহজ হবে। ভদ্র লোক তালিকা টি দেখে বললেন, নিউটনের তত্ত্ব বোঝা আমার সাধ্যের বাহিরে। কারণ প্রাথমিক তালিকার এইকটি বই পড়া শেষ করতেই আমার অর্ধেক জীবন কেটে যাবে।



Philosophiac naturalis principia mathematica প্রকাশিত হয় ১৬৪৭ সালে। ল্যাটিন ভাষায় লেখা এই বইটি তিন খন্ডে বিভক্ত।



প্রথম খন্ডে নিউটন গতি সূত্র সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। ‍তিনটি গতি সূত্র হলো, (১) প্রত্যেকটি বস্তু চিরকাল সরল রেখা অবলম্বন করে সমবেগে চলতে থাকে। (২) বস্তুর উপর প্রযুক্ত বল বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হারের সমানুপাতিক এবং বল যেদিকে ক্রিয়া করে, ভরবেগের পরিবর্তন ও সে দিকে ঘটে। (৩) পত্যেকটি ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।



প্রিন্সিপিয়া গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডে তিনি গ্যাস, ফ্লুইড বস্তুর গতির কথা আলোচনা করেছেন। গ্যাসকে কতকগুলো স্থিতিস্থাপন অণুর সমষ্টি ধরে নিয়ে তিনি বয়েলের সূত্র প্রমাণ করেন। গ্যাসের উপর চাপের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পরোক্ষ ভাবে শব্দতরঙ্গের গতি বেগ ও নির্ধারণ করেন। তার এই তত্ত্বে কিছু ভুল ত্রুটি ছিল। উত্তর কালে অন্য বিজ্ঞানীরা এইসব ভুল-ত্রুটি সংশোধন করেন। তৃতীয় খন্ডে মধ্যাকর্ষণ শক্তি সম্পর্কে খুঁটিনাটি আলোচনা করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন মধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবেই সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহ গুলো ঘুরছে।





তেমনি পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে চাঁদ। দুটি বস্তুর মধ্যে মহাকর্ষীয় বল তাদের ভরের সমানুপাতিক ও দূরুত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক। পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরুত্ব পৃথিবীর ব্যসার্ধের ৬০ গুন। এই দূরুত্ব থেকে চাঁদ পৃথিবী কে প্রদক্ষিন করছে। নিউটন লক্ষ করেছিলেন সূর্য ও গ্রহ গুলোর মধ্যে প্রত্যেকটি গ্রহ ও তাদের উপগ্রহ গুলোর পৃথিবীর সমুদ্র ও চাঁদ এবং সূর্যের মধ্যে এমনকি জোয়ার-ভাটা ও সাধারণ ভাবে জগতের যে কোন দুটি বস্তুর মধ্যে একই মহাকর্ষ শক্তি কার্যকরী। এছাড়াও তিনি আরও একটি সমস্যার সমাধান করেছিলেন।





তিনি প্রমাণ করলেন একটি সমরুপ গোলাকার বস্তুর ভিতরের প্রতিটি কণা যদি বাইরের একটি কণাকে মধ্যাকর্ষণ বলের সূত্র অনুসারে আকর্ষণ করে তাহলে বাইরের কণাটির উপর যে বল কাজ করবে সেটি এমন হবে যেন গোলাকার বস্তুটির সমস্ত ভর তার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত।



তাঁর প্রতি সমালোচনা করা হলো, তিনি তার তত্ত্বে বিশ্বপ্রকৃতিকে যেভাবে বিবেচনা করেছেন তা থেকে মনে হয় এ সমস্তই যেন এক বিশৃঙ্খল মনের প্রাণহীন সৃষ্টির কাহিনী।



নিউটন তার জবাবে বললেন, প্রকৃত পক্ষে এই বিশ্বপ্রকৃতি এমন সুশৃঙ্খল সুসামঞ্জস্যভাবে সৃষ্টি হয়েছে মনে হয় এর পশ্চাতে কোন ঐশ্বরিক স্রষ্টা রয়েছেন।



নিউটনের এই বিচিত্র মানসিকতার জন্য কোন মানুষই তাকে সহজভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। হয়ত নিজেই নিজের বিরাটতত্ত্বকে সঠিকভাবে চিনতে পারেনি। অসাধারণ আবিস্কারের পরও তিনি ছিলেন অসুখী মানুষ।



principia প্রকাশের পরই নিউটন সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে আসেন। যখন দ্বিতীয় জেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাইলেন, তিনি তার সক্রিয় বিরোধী হয়ে উঠলেন। রাজপরিবারের উৎখাতের পর ১৬৯৪ সালে নতুন সংবিধান তৈরির জন্য যে কনভেনশন গড়ে উঠল, নিউটন তার সদস্য হলেন।



রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন নিউটন। ১৬৯০ সালে কনভেনশনের পরিসমাপ্তি ঘটল, নিউটনের রাজনৈতিক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল।



১৭০৩ সালে নিউটনের জীবনে এল এক অভূতপূর্ব সম্মান। তিনি রয়াল সোসাইটির সভাপতি হলেন। আমৃত্যু ‍তিনি সেই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।



১৭০৫ সালে রাণী এ্যানি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন। রাণীর পক্ষ থেকে নিউটন কে নাইটহুড উপাধিতে ভূষিত করা হল। এই সময় ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস ( Differenctial calculus)- এর প্রথম আবিষ্কর্তা হিসাবে জার্মান দার্শনিক লিবনিজ (Leibniz /Leibnitz) এর সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন। ইংল্যান্ডের রয়াল একাডেমী জানতে পারে লিবনিজ Differenctial calculus- এর আবিষ্ককর্তা হিসাবে দাবি জানাচ্ছেন। রয়াল একাডেমির সদস্যরা ক্রোধে ফেটে ফড়ল। তাদের সভাপতির কৃতিত্বকে এক বিদেশী চুরি করে নিজের নামে প্রাচার করতে চাইছে। কারণ তারা বিশ্বাস করতেন নিউটনই প্রথম calculus- এর সম্ভাবনা, তার অস্তিত্ব সম্বন্ধে লিবনিজের কাছে বলেছিলেন। লিবনিজ একে উন্নত করেছে, সঠিক বিস্তৃতি ‍দিয়েছে কিন্তু আবিষ্কার করেনি।



তবে নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকদের মতে নিউটন ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাসের উদ্ভাবক হলেও লিবনিজের পদ্ধতি ছিল অনেক সহজ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। ১৭২৭ সাল, নিউটন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। চিকিৎসাতে কোন সুফল পাওয়া গেলো না। অবশেষে ২০ শে মার্চ মহাবিজ্ঞানী নিউটন তার প্রিয় অনন্ত বিশ্বপ্রকৃতির বুকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেন। সাত দিন পর তাকে ওয়েস্ট মিনিস্টার এ্যাবিতে সমাধিস্থ করা হল।



সমস্ত দেশ অবনত মস্তকে শ্রদ্ধাঞ্জলী জানায় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই জ্ঞানতাপসকে। যদিও নিজেকে তিনি কখনও পন্ডিত বা জ্ঞানী ভাবেননি। মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে তিনি লিখেছেন, ‍“পৃথিবীর মানুষ আমাকে কি ভাবে জানিনা, কিন্তু নিজের সম্বন্ধে আমি মনে করি আমি একটা ছোট ছেলের মত সাগরের তীরে খেলা করছি আর খুজে ফিরেছি সাধারনের চেয়ে সামান্য আলাদা পাথরের নুড়ি বা ঝিনুকের  খোসা। সামনে আমার পড়ে রয়েছে অনাবিষ্কৃত বিশাল জ্ঞানের সাগর”।